যুক্তরাষ্ট্র   শনিবার ২৯ আগস্ট ২০২৬, শনিবার ১৩ ভাদ্র ১৪৩৩

রংপুরে একই পরিবারের চারজনকে হত্যা: ময়নাতদন্তে ধর্ষণের চিহ্ন মেলেনি

এখন বাংলা ডেস্ক

প্রকাশিত: ২৭ আগস্ট ২০২৬, ০৫:৪৩ AM

১১
রংপুরে একই পরিবারের চারজনকে হত্যা: ময়নাতদন্তে ধর্ষণের চিহ্ন মেলেনি

রংপুর নগরের মাছুয়াপাড়া এলাকায় একই পরিবারের চারজনকে হত্যার ঘটনায় নিহত দুই নারী—প্রীতিলতা চক্রবর্তী ও তাঁর মেয়ে আগামী চক্রবর্তী প্রার্থির—ময়নাতদন্তে ধর্ষণের কোনো চিহ্ন পাওয়া যায়নি। তাঁদেরসহ পরিবারের চার সদস্যের মৃত্যুর কারণ শ্বাসরোধ বলে ময়নাতদন্তে জানা গেছে।

রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের (আরপিএমপি) কমিশনার মোহাম্মদ আবদুল মাবুদ আজ বৃহস্পতিবার নগরের কনফারেন্স রুমে এক সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান।

পুলিশ কমিশনার বলেন, হত্যার ঘটনায় গ্রেপ্তার দুই অভিযুক্তের ডিএনএ ও ডোপ পরীক্ষা দেশের আইন অনুযায়ী করা হবে। ময়নাতদন্তের তথ্য এবং আদালতে দেওয়া তাঁদের স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি যাচাই করে তদন্ত এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।

কীভাবে হত্যাকাণ্ড

পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, কয়েক দিন আগে মাছুয়াপাড়া এলাকায় নিজ বাড়িতে অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী জুয়েল (৬৫), তাঁর স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী (৫০), মেয়ে আগামী চক্রবর্তী প্রার্থি (২৫) ও ছেলে আয়ুষ চক্রবর্তী প্রিয়মকে (১২) শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয়।

শনিবার রাতে বাড়ি থেকে চারজনের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। পরে নিহত গণপতি চক্রবর্তী জুয়েলের বড় ভাই গোপীনাথ চক্রবর্তী অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের আসামি করে রংপুর মেট্রোপলিটন কোতোয়ালি থানায় হত্যা মামলা করেন।

পুলিশের বিশেষ দল অভিযান চালিয়ে এ ঘটনায় মুগ্ধ দাস (২৩) ও সিদ্ধার্থ দাসকে (১৯) গ্রেপ্তার করে। তাঁরা রংপুর চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন।

পুলিশের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, মুগ্ধ ও সিদ্ধার্থ বৃহস্পতিবার মধ্যরাতের পর ওই শিক্ষকের বাড়ির ছাদে যান। সেখানে একটি পানির ট্যাংকের আড়ালে বসে তাঁরা ইয়াবা সেবন করেন। তাঁদের জবানবন্দিতে ইয়াবা সেবনের পরিমাণ নিয়ে সামান্য পার্থক্য রয়েছে।

সকালে গণপতি চক্রবর্তী তাঁদের ছাদে দেখতে পেয়ে বকাঝকা করেন। এতে তাঁরা ভয় পান এবং গণপতি চক্রবর্তী চিৎকার করে অন্যদের জানিয়ে দিতে পারেন—এমন আশঙ্কায় তাঁকে হত্যার সিদ্ধান্ত নেন বলে জবানবন্দিতে উল্লেখ করেছেন।

পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, তাঁরা গণপতি চক্রবর্তীর গলায় তোয়ালে পেঁচিয়ে দুই দিক থেকে টানেন। একপর্যায়ে তাঁর মৃত্যু হয়। ময়নাতদন্তেও তাঁর মৃত্যুর কারণ শ্বাসরোধ বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

স্ত্রী ও মেয়েকেও হত্যা

গণপতি চক্রবর্তীর মরদেহ ঢেউটিন দিয়ে ঢাকার সময় তাঁর স্ত্রী ও মেয়ে সম্ভবত কোনো শব্দ শুনে ছাদে চলে আসেন। তাঁরা চিৎকার শুরু করলে মুগ্ধ ও সিদ্ধার্থ তাঁদেরও শ্বাসরোধ করে হত্যা করেন বলে জবানবন্দিতে উল্লেখ করেছেন।

পুলিশ জানায়, প্রথমে মুগ্ধ প্রীতিলতা চক্রবর্তীর গলা চেপে ধরেন এবং সিদ্ধার্থ তাঁর মেয়ের গলা চেপে ধরেন। পরে গামছা ও দড়ি ব্যবহার করে আগামী চক্রবর্তী প্রার্থিকে শ্বাসরোধ করা হয়।

ময়নাতদন্তে মা ও মেয়ের শরীরে ধর্ষণের কোনো চিহ্ন পাওয়া যায়নি বলে জানিয়েছেন পুলিশ কমিশনার।

শিশুটিকে হত্যার কারণ

পুলিশের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, পরে দুই অভিযুক্ত নিচতলায় গিয়ে গণপতি চক্রবর্তীর ছেলে আয়ুষকে জেগে থাকা অবস্থায় দেখতে পান। আয়ুষ সিদ্ধার্থকে চিনতে পেরে তাঁকে নাম ধরে ডাক দেয়।

পুলিশ কমিশনার বলেন, এর আগে শিশুটি ঘুমিয়ে ছিল বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হয়েছিল। কিন্তু আদালতে দেওয়া জবানবন্দিতে অভিযুক্তরা জানিয়েছেন, শিশুটি জেগে উঠে সিদ্ধার্থকে চিনতে পেরেছিল। সে অন্যদের বিষয়টি জানিয়ে দিতে পারে—এই আশঙ্কায় তাঁরা শিশুটিকেও হত্যা করেন।

জবানবন্দি অনুযায়ী, কাপড় ও দড়ি ব্যবহার করে শিশুটিকে শ্বাসরোধ করা হয়।

ডাকাতির মতো দেখানোর চেষ্টা

চারজনকে হত্যার পর ঘটনাটিকে চুরি বা ডাকাতির মতো দেখানোর চেষ্টা করেন অভিযুক্তরা। তাঁরা বাড়ির ড্রয়ার খুলে জিনিসপত্র এলোমেলো করেন এবং বিভিন্ন গয়না নিয়ে নেন। এসব গয়না প্লাস্টিকের বাক্স ও কাপড়ের প্যাকেটে রাখা হয়। বাড়ি থেকে ১৫ হাজার টাকা নেওয়ার কথাও জবানবন্দিতে উল্লেখ করা হয়েছে।

বাড়িতে সিসিটিভি ক্যামেরা থাকতে পারে—এমন আশঙ্কায় তাঁরা একটি পুরোনো প্লায়ার্স দিয়ে বৈদ্যুতিক তার কেটে দেন বলে পুলিশ জানিয়েছে।

পরে মা ও মেয়ের মরদেহ ছাদের গেটের ভেতরে এমনভাবে রাখা হয়, যাতে পাশের বাড়ির ছাদ থেকে সেগুলো দেখা না যায়।

পরদিন শুক্রবার নামাজের সময় বাইরে মানুষের চলাচল কমে গেলে তাঁরা ছাদ থেকে পাশের বাড়ির ছাদে যান। এরপর দেয়াল টপকে সেখান থেকে বেরিয়ে যান।

পুলিশ কমিশনার বলেন, মুগ্ধ দাসের আদালতে দেওয়া জবানবন্দিতেও হত্যাকাণ্ডের প্রায় একই ধরনের বর্ণনা পাওয়া গেছে। ময়নাতদন্তের তথ্য ও আসামিদের জবানবন্দি মিলিয়ে তদন্ত এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।

চাঞ্চল্যকর এই হত্যাকাণ্ডের তদন্তে সাধারণ মানুষের সহযোগিতা চেয়েছেন পুলিশ কমিশনার। কোনো ব্যক্তি এ ঘটনা সম্পর্কে কিছু শুনে বা দেখে থাকলে তা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে জানানোর অনুরোধ করেছেন তিনি।

আরএস-রাসেল

০ মন্তব্য


কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!