নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ উপজেলার কায়েতপাড়া ও রূপগঞ্জ ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকায় পৈতৃক ভিটেমাটি ও কৃষিজমি রক্ষার দাবিতে সংবাদ সম্মেলন করেছে ‘পৈতৃক ভিটা-মাটি সংরক্ষণ পরিষদ’। শুক্রবার (২৮ আগস্ট) আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে বক্তারা ‘জলসিঁড়ি আবাসন প্রকল্পের’ বিরুদ্ধে জমি ক্রয় না করে কৃষিজমি ও বসতভিটায় বালু ভরাট, রাস্তা নির্মাণ এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের উচ্ছেদের পাঁয়তানার অভিযোগ করেন।
সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে সংগঠনের নেতারা বলেন, ২০১০ সাল থেকে কায়েতপাড়া ও রূপগঞ্জ ইউনিয়নের ১৭টি মৌজায় প্রায় ৭ হাজার বিঘা কৃষিজমি নিয়ে বিরোধের সূত্রপাত হয়। তাদের অভিযোগ, জমি অধিগ্রহণ বা জমির মালিকদের যথাযথ সম্মতি ছাড়াই বিভিন্ন সময়ে বালু ভরাটের মাধ্যমে কৃষিজমি দখলের চেষ্টা করা হয়েছে। এর প্রতিবাদ করতে গিয়ে স্থানীয় বাসিন্দাদের বিরুদ্ধে হামলা ও মামলা এবং গুলিবর্ষণের ঘটনাও ঘটেছে বলে দাবি করেন তারা।
তাদের অভিযোগ, পরবর্তীতে ‘জলসিঁড়ি প্রকল্প-১’-এর পাশাপাশি ‘জলসিঁড়ি প্রকল্প-২’-এর নামে একটি ডিমার্কেশন নকশা তৈরি করা হয়। ওই নকশার ভিত্তিতে জমি ক্রয় না করেই বিভিন্ন এলাকায় বালু ভরাট ও রাস্তা নির্মাণ করা হচ্ছে। এতে এলাকার কৃষিনির্ভর মানুষের জীবিকা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বলেও দাবি করেন বক্তারা।
সংবাদ সম্মেলনে আরও অভিযোগ করা হয়, বসতবাড়ির আশপাশে ব্যাপকভাবে বালু ভরাটের কারণে পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা ব্যাহত হয়ে কৃত্রিম জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হচ্ছে। এতে স্থানীয় কৃষক, জেলে ও সাধারণ মানুষ ক্ষতির মুখে পড়েছেন।
ইচ্ছাখালী খাল উদ্ধারের দাবি
সংগঠনটির অন্যতম প্রধান দাবি রূপগঞ্জের ঐতিহাসিক ইচ্ছাখালী খাল পুনরুদ্ধার করা। বক্তারা দাবি করেন, দীর্ঘদিন ধরে খালটি নৌচলাচল, কৃষিকাজ, সেচ ও মাছ আহরণের কাজে ব্যবহৃত হয়ে আসছিল। কিন্তু বালু ভরাটের কারণে খালটির স্বাভাবিক প্রবাহ বন্ধ হয়ে গেছে। এতে আশপাশের প্রায় ২৪টি গ্রামের মানুষ জলাবদ্ধতার ভোগান্তিতে পড়েছেন বলে অভিযোগ করেন তারা।
তারা অবিলম্বে খাল থেকে বালু অপসারণ, পুনঃখনন এবং আগের অবস্থায় নৌচলাচলের উপযোগী করার দাবি জানান।
প্রশাসনের কাছে একাধিক অভিযোগ
সংবাদ সম্মেলনে বক্তারা জানান, ভুক্তভোগী জমির মালিক ও স্থানীয় বাসিন্দাদের পক্ষ থেকে রূপগঞ্জ থানায় শতাধিক লিখিত অভিযোগ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ও জেলা প্রশাসকের (ডিসি) কাছে স্মারকলিপি দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া কয়েকটি গ্রাম নিয়ে সভা-সমাবেশ ও মানববন্ধন কর্মসূচিও পালন করা হয়েছে বলে জানান তারা।
বক্তারা বলেন, বিভিন্ন পর্যায়ে অভিযোগ ও আবেদন করা হলেও এখন পর্যন্ত তারা কাঙ্ক্ষিত প্রতিকার পাননি।
তাদের ভাষ্য, “আমরা বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে নই; আমরা জলসিঁড়ি প্রকল্পের বেআইনি ও অমানবিক দখলদারিত্বের বিরুদ্ধে।” তারা দাবি করেন, কোনো সরকারি সংস্থা বা বাহিনীর নাম ব্যবহার করে সাধারণ মানুষের জমি ও বসতভিটা দখলের সুযোগ থাকা উচিত নয়।
৯ দফা দাবি
সংবাদ সম্মেলনে পৈতৃক ভিটা-মাটি সংরক্ষণ পরিষদের পক্ষ থেকে ৯ দফা দাবি তুলে ধরা হয়। দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে—
১. জমি ক্রয় না করে অবৈধভাবে বালু ভরাট ও রাস্তা নির্মাণ বন্ধ করা।
২. ইচ্ছাখালী খাল থেকে অবৈধ বালু অপসারণ করে পুনঃখনন ও চালু করা।
৩. সাধারণ মানুষের বসতবাড়ির বাইরে আবাসন প্রকল্প স্থাপন করা।
৪. প্রকল্পের ডিমার্কেশন নির্ধারণ ও প্রকাশ এবং দৃশ্যমান ম্যাপ টাঙিয়ে রাখা।
৫. ডিমার্কেশনের ভেতরে অবিক্রয়কৃত জমির মালিকদের আনুপাতিক হারে বিকল্প জমি বা প্লট দেওয়া।
৬. সাধারণ মানুষের বসতবাড়ি থেকে কমপক্ষে ৩০০ মিটার দূরে প্রকল্পের সীমানা নির্ধারণ করা।
৭. বসতবাড়ির ওপর দিয়ে প্রকল্পের রাস্তা নির্মাণ না করা এবং বিশেষ প্রয়োজনে রাস্তা নির্মাণ করতে হলে উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ ও প্লট দেওয়া।
৮. উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসন নিশ্চিত না করে কোনো বাড়ির মালিককে উচ্ছেদ না করা।
৯. বসতবাড়ির চেয়ে উঁচু করে বালু ভরাট করে কৃত্রিম জলাবদ্ধতা ও পরিবেশগত বিপর্যয় সৃষ্টি বন্ধ করা।
সংবাদ সম্মেলনে সংগঠনের নেতারা বলেন, তাদের দাবিগুলো দ্রুত বাস্তবায়ন করা না হলে পৈতৃক সম্পত্তি ও জন্মভূমি রক্ষায় কায়েতপাড়াসহ রূপগঞ্জের সর্বস্তরের মানুষকে সঙ্গে নিয়ে আরও কঠোর আন্দোলনে যেতে বাধ্য হবেন তারা। প্রয়োজনে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ও সেনাবাহিনী সদর দপ্তরে স্মারকলিপি দেওয়ারও ঘোষণা দেন তারা।
সংবাদ সম্মেলনে পৈতৃক ভিটা-মাটি সংরক্ষণ পরিষদের আহ্বায়ক, সদস্য সচিবসহ কায়েতপাড়া ও রূপগঞ্জ ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রামের ভুক্তভোগী বাসিন্দারা উপস্থিত ছিলেন।
তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে জলসিঁড়ি আবাসন প্রকল্প কর্তৃপক্ষের বক্তব্য তাৎক্ষণিকভাবে পাওয়া যায়নি। অভিযোগের বিষয়ে প্রকল্প কর্তৃপক্ষের বক্তব্য পাওয়া গেলে তা প্রতিবেদনে যুক্ত করা হবে।
কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!