জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় তরুণদের নেতৃত্ব, আঞ্চলিক সহযোগিতা ও পরিবেশ সুরক্ষায় অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে ২০২৬ সালের সোশ্যাল ইমপ্যাক্ট প্রজেক্ট অব দ্য ইয়ার পুরস্কার পেয়েছে বাংলাদেশ থেকে পরিচালিত আঞ্চলিক উদ্যোগ ইন্টারন্যাশনাল ক্লাইমেট ক্যাম্প (আইসিসি)।
বাংলাদেশ প্রজেক্ট ম্যানেজমেন্ট ইনস্টিটিউটের (পিএমআই) বাংলাদেশ চ্যাপ্টারের আয়োজনে অনুষ্ঠিত ‘বাংলাদেশ প্রজেক্ট ম্যানেজমেন্ট সিম্পোজিয়াম অ্যান্ড অ্যাওয়ার্ডস ২০২৬’-এ এ পুরস্কার দেওয়া হয়। গত ২৬ সেপ্টেম্বর ঢাকার র্যাডিসন ব্লু ওয়াটার গার্ডেন হোটেলের গ্র্যান্ড বলরুমে আয়োজিত অনুষ্ঠানে ‘প্রজেক্ট অব দ্য ইয়ার (সোশ্যাল ইমপ্যাক্ট—স্মল প্রজেক্ট)’ বিভাগে এ স্বীকৃতি পায় উদ্যোগটি।
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় তরুণদের সম্পৃক্ত করা, আঞ্চলিক সহযোগিতা বাড়ানো এবং মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতার সঙ্গে নীতিনির্ধারণী আলোচনার সংযোগ তৈরিতে অবদানের জন্য এ পুরস্কার দেওয়া হয়েছে।
ইন্টারন্যাশনাল ক্লাইমেট ক্যাম্প যৌথভাবে আয়োজন করে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার ফর ক্লাইমেট চেঞ্জ অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল রিসার্চ (সিথ্রিইআর), ওয়াটারকিপার্স বাংলাদেশ, এশিয়ান পিপলস মুভমেন্ট অন ডেট অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (এপিএমডিডি), ল্যান্ড আওয়ার ফিউচার নেপাল, সেন্টার ফর অ্যাটমোস্ফেরিক পলিউশন স্টাডিজ (ক্যাপস) এবং মিশন গ্রিন বাংলাদেশ।
এ উদ্যোগে সহযোগিতা করেছে নেদারল্যান্ডস দূতাবাস, ক্লাইমেট অ্যাকশন নেটওয়ার্ক সাউথ এশিয়া (কানসা), প্রাইড পাকিস্তান, শেরা নেটওয়ার্কসহ বিভিন্ন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সংস্থা। এ ছাড়া পোখরা বিশ্ববিদ্যালয়, স্ট্যামফোর্ড ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ, ত্রিভুবন বিশ্ববিদ্যালয়, কাঠমান্ডু বিশ্ববিদ্যালয় এবং স্কটল্যান্ডের ইউনিভার্সিটি অব ডান্ডির বিঙ্কস ইনস্টিটিউট অব সাসটেইনেবিলিটিও এতে যুক্ত ছিল।
নেপালে অংশ নেন ২০০-এর বেশি তরুণ
২০২৫ সালে প্রথম আয়োজনের ধারাবাহিকতায় এ বছরের ৭ থেকে ১১ জুলাই নেপালের কাঠমান্ডু ও পোখরায় অনুষ্ঠিত হয় ইন্টারন্যাশনাল ক্লাইমেট ক্যাম্পের দ্বিতীয় আসর। এতে এশিয়ার বিভিন্ন দেশের ২০০ জনের বেশি তরুণ প্রতিনিধি, গবেষক, পরিবেশ আন্দোলনকর্মী ও জলবায়ু বিশেষজ্ঞ অংশ নেন।
আয়োজকদের লক্ষ্য ছিল জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় তরুণদের নেতৃত্বের বিকাশ, অভিজ্ঞতা বিনিময় এবং আঞ্চলিক পর্যায়ে যৌথ কর্মপরিকল্পনা তৈরি করা।
ক্যাম্পে তরুণদের সঙ্গে নীতিনির্ধারকদের সরাসরি মতবিনিময়ের সুযোগ তৈরি করা হয়। এতে উপস্থিত ছিলেন নেপালের কৃষি, বন ও পরিবেশমন্ত্রী গীতা চৌধুরী, দেশটির চারজন সংসদ সদস্য এবং জাতিসংঘ মহাসচিবের জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক যুব উপদেষ্টা ফারজানা ফারুক ঝুমু। এ ছাড়া বিভিন্ন আন্তর্জাতিক পরিবেশবাদী সংগঠনের প্রতিনিধিরাও অংশ নেন।
মাঠপর্যায়ে জলবায়ু অভিযোজনের অভিজ্ঞতা
ক্যাম্পের অংশ হিসেবে অংশগ্রহণকারীরা প্রচলিত শ্রেণিকক্ষের বাইরে গিয়ে মাঠপর্যায়ে জলবায়ু অভিযোজন ও পরিবেশ সুরক্ষার বিভিন্ন কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করেন।
ত্রিশূলী নদীর তীরবর্তী কৃষক সম্প্রদায়ের সৌরবিদ্যুৎ ও জৈব সার ব্যবহারের অভিজ্ঞতা সম্পর্কে জানেন তাঁরা। পাশাপাশি বান্দিপুরের স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সঙ্গে বৃক্ষরোপণ কর্মসূচিতেও অংশ নেন।
পাহাড়ি পথে চলাচলের সময় বাসের ভেতরেও বিষয়ভিত্তিক আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। এতে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব, পরিবেশ সুরক্ষা এবং টেকসই উন্নয়নের বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা করেন অংশগ্রহণকারীরা।
পোখরা বিশ্ববিদ্যালয়ে আয়োজিত অ্যাকশন ল্যাবে জলবায়ু রাজনীতি, প্রকৃতিভিত্তিক সমাধান, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, টেকসই পানি ব্যবস্থাপনা, শিল্পদূষণ এবং যুব নেতৃত্বের মতো বিষয় নিয়ে কাজ করেন তাঁরা। এসব আলোচনার ভিত্তিতে নিজ নিজ দেশে বাস্তবায়নের জন্য সুনির্দিষ্ট প্রচার ও কর্মপরিকল্পনাও তৈরি করা হয়।
আয়োজকদের মতে, স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জলবায়ু অভিযোজনের অভিজ্ঞতার সঙ্গে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক নীতিনির্ধারণী আলোচনার সংযোগ তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে এই ক্যাম্প।
‘তরুণেরা শুধু সংকটের দর্শক নয়, সমাধানের কারিগর’
পুরস্কার গ্রহণের পর মিশন গ্রিন বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা ও নির্বাহী পরিচালক আহসান রনি বলেন, পিএমআই বাংলাদেশের এ স্বীকৃতি তাঁদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। মাঠপর্যায়ের কার্যক্রম থেকে নীতিনির্ধারণী পর্যায় পর্যন্ত কাজের যে মডেল তাঁরা তৈরি করেছেন, এ পুরস্কার তার স্বীকৃতি।
তিনি বলেন, জলবায়ু ঝুঁকিতে থাকা এশিয়ার তরুণেরা শুধু সংকটের দর্শক নন, তাঁরা সমাধান তৈরিরও গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার। সেই ধারণা থেকেই ইন্টারন্যাশনাল ক্লাইমেট ক্যাম্পের যাত্রা শুরু।
আহসান রনি আরও বলেন, এ স্বীকৃতি ক্যাম্পের সঙ্গে যুক্ত সব অংশীদার, পরামর্শক ও ২০০ জনের বেশি তরুণ প্রতিনিধির সম্মিলিত প্রচেষ্টার ফল।
স্ট্যামফোর্ড ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশের বিজ্ঞান অনুষদের ডিন ও ক্যাপসের চেয়ারম্যান অধ্যাপক আহমদ কামরুজ্জামান মজুমদার বলেন, পিএমআইয়ের এ স্বীকৃতি ব্যবহারিক বিজ্ঞান, প্রাতিষ্ঠানিক গবেষণা ও তরুণদের নাগরিক অংশগ্রহণের সমন্বয়ের গুরুত্ব তুলে ধরেছে।
তিনি বলেন, বায়ুদূষণ থেকে শুরু করে হিমালয়ের হিমবাহ গলে যাওয়ার মতো জলবায়ু সংকট মোকাবিলায় বহুমাত্রিক পরিকল্পনা ও কার্যকর বাস্তবায়ন প্রয়োজন। ইন্টারন্যাশনাল ক্লাইমেট ক্যাম্প শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও নাগরিক সমাজের মধ্যে আঞ্চলিক সহযোগিতার একটি উদাহরণ তৈরি করেছে।
ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের সিথ্রিইআরের ডেপুটি ডিরেক্টর রউফা খানম বলেন, জলবায়ু অভিযোজনের কার্যক্রম স্থানীয় জনগোষ্ঠীর নেতৃত্বে, তথ্যভিত্তিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক হওয়া জরুরি। ইন্টারন্যাশনাল ক্লাইমেট ক্যাম্প প্রাতিষ্ঠানিক গবেষণার সঙ্গে মাঠপর্যায়ের বাস্তবতার সংযোগ তৈরি করেছে।
তিনি আরও বলেন, নীতিনির্ধারণী আলোচনায় নারী ও তরুণদের অংশগ্রহণ বাড়ানোর পাশাপাশি ভবিষ্যৎ জলবায়ু নেতাদের গড়ে তুলতে এ ধরনের আঞ্চলিক উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
পিএমআই বাংলাদেশের এ পুরস্কার ইন্টারন্যাশনাল ক্লাইমেট ক্যাম্পের ভবিষ্যৎ কার্যক্রম সম্প্রসারণ এবং দক্ষিণ এশিয়ায় জলবায়ু শিক্ষা ও সহযোগিতা জোরদারে নতুন অনুপ্রেরণা জোগাবে বলে মনে করছেন আয়োজকেরা।
কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!