যুক্তরাষ্ট্র   শুক্রবার ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, শুক্রবার ২৬ ভাদ্র ১৪৩৩

সামাজিক সম্প্রীতি রক্ষা ও অবক্ষয়মূলক কনটেন্ট প্রতিরোধই সরকারের লক্ষ্য: তথ্যমন্ত্রী

এখন বাংলা ডেস্ক

প্রকাশিত: ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৬:১৪ AM

সামাজিক সম্প্রীতি রক্ষা ও অবক্ষয়মূলক কনটেন্ট প্রতিরোধই সরকারের লক্ষ্য: তথ্যমন্ত্রী

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিশৃঙ্খলা বন্ধ করে সামাজিক সম্প্রীতি রক্ষা এবং জনপরিসরে নৈতিক অবক্ষয়মূলক কনটেন্ট প্রতিরোধ করাই সরকারের অন্যতম লক্ষ্য বলে জানিয়েছেন তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রী আন্দালিভ রহমান।

তিনি বলেছেন, কোনো অবস্থাতেই মুক্তচিন্তা, সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা বা সাংবাদিকদের দমনের উদ্দেশ্যে ‘সাইবার সুরক্ষা (সংশোধন) আইন, ২০২৬’ করা হচ্ছে না।

আজ বৃহস্পতিবার সচিবালয়ে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে আইনটির খসড়া পর্যালোচনা সভা শেষে সাংবাদিকদের এসব কথা বলেন তথ্যমন্ত্রী।

আন্দালিভ রহমান বলেন, অতীতে ডিজিটাল সিকিউরিটি অ্যাক্টসহ বিভিন্ন আইনের মাধ্যমে সংবাদমাধ্যমকে দমিয়ে রাখার ঘটনা ঘটেছে। গণমাধ্যমের ওপর আইনের অপব্যবহারের সেই প্রবণতা নিয়ে বর্তমান সরকার অত্যন্ত সতর্ক।

তিনি বলেন, খসড়া আইনে এমন কোনো দ্ব্যর্থবোধক শব্দ বা ভাষা রাখা হবে না, যা ভবিষ্যতে গণমাধ্যমের ওপর অপব্যবহারের সুযোগ তৈরি করতে পারে। এ কারণে অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে খসড়াটি পরিমার্জন করা হচ্ছে।

তথ্যমন্ত্রী বলেন, ‘বাক্‌স্বাধীনতার নামে বিভিন্ন অনলাইন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অশালীন গালিগালাজ, সাইবার বুলিং ও কুরুচিপূর্ণ কনটেন্ট ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে। এগুলো আমাদের সামাজিক মূল্যবোধ ও নীতি-নৈতিকতাকে বিনষ্ট করছে। আমাদের প্রধান কাজ হলো সামাজিক অবক্ষয় রোধ করা এবং সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা রক্ষা করা।’

এই দুই লক্ষ্য কীভাবে কোনো ধরনের সংঘাত ছাড়াই সমন্বয় করা যায়, তা নিয়ে অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনা চলছে বলেও জানান তিনি।

সচেতনতার ওপরও গুরুত্ব

আইনের প্রয়োগের পাশাপাশি সামাজিক সচেতনতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেন তথ্যমন্ত্রী। তিনি বলেন, শুধু কঠোর আইন করে সব ধরনের অপরাধ দমন করা সম্ভব নয়।

সাইবার স্পেসে কোনো তথ্যের সত্যতা যাচাই না করে মানহানিকর তথ্য বা পোস্ট শেয়ার করাও যে অপরাধের আওতায় পড়তে পারে, সে বিষয়ে জনগণকে সচেতন করতে সরকারের পক্ষ থেকে বিশেষ কর্মসূচি নেওয়া হবে বলে জানান তিনি।

এর আগে সকালে পরামর্শ সভার সূচনা বক্তব্যে আন্দালিভ রহমান বলেন, সাইবার সুরক্ষা আইন চূড়ান্ত করার আগে তথ্য প্রকাশ, স্বাধীন সাংবাদিকতা ও মতপ্রকাশের সুরক্ষার স্বার্থে গণমাধ্যমের সঙ্গে সরাসরি সংলাপ ও মতামত নেওয়া জরুরি।

তিনি বলেন, ‘আপনারাই সবচেয়ে ভালো জানেন, একটি আইনের ভাষা মাঠপর্যায়ে কীভাবে কাজ করে এবং কোথায় অস্পষ্টতা তৈরি হতে পারে। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের সাইবার সুরক্ষা ও গণমাধ্যমের স্বাধীনতা—এই দুটি লক্ষ্য পরস্পরবিরোধী নয়, বরং একে অপরের পরিপূরক হওয়া উচিত।’

গণমাধ্যমের সম্পাদকদের আশ্বস্ত করে তথ্যমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা কোনো অসৎ উদ্দেশ্য নিয়ে এই আইন সংশোধন করছি না। প্রিন্ট মিডিয়ার এ নিয়ে উদ্বিগ্ন হওয়ার কোনো কারণ নেই। আইনের কোথায় অস্পষ্টতা বা জটিলতা আছে, আপনারা মুক্তমনে পরামর্শ দিন। আমরা তা গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করব।’

সাইবার অপরাধ বেড়েছে: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

সভায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, সামাজিক ভারসাম্য বজায় রাখতে সাইবার সুরক্ষা আইনের সংশোধন প্রয়োজন। একই সঙ্গে আইনটি যাতে অপব্যবহারের সুযোগ তৈরি না করে, সে বিষয়েও সরকার প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিচ্ছে।

তিনি বলেন, বিশ্বব্যাপী সাইবার অপরাধ আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে। অনেক দেশে মোট অপরাধের ৪৪ শতাংশ এখন সাইবার স্পেসে সংঘটিত হচ্ছে। বাংলাদেশেও অনলাইন জালিয়াতি, সেক্সটোরশন, নারীদের ব্ল্যাকমেইলিং এবং সামাজিক ও ধর্মীয় সম্প্রীতি বিনষ্টের মতো অপরাধ প্রতিরোধে যুগোপযোগী আইনের বিকল্প নেই।

তবে প্রধানমন্ত্রী স্পষ্ট নির্দেশনা দিয়েছেন, অংশীজনদের সঙ্গে মতবিনিময়ের মাধ্যমে আইনটি পরিমার্জন করতে হবে, যাতে এর কোনো অপব্যবহার বা বিতর্কের সৃষ্টি না হয় বলে জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।

আইনের অপব্যবহার ঠেকানোর দাবি

পরামর্শ সভায় অংশ নিয়ে বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার (বাসস) ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান সম্পাদক কাদের গনি চৌধুরী বলেন, বিগত সরকারের সময়ে প্রণীত নিপীড়নমূলক আইনের বিতর্কিত ধারাগুলো বাতিল ও সংশোধন করে নতুন সাইবার সুরক্ষা আইন করার উদ্যোগ ইতিবাচক।

মিথ্যা অভিযোগকারীদের বিরুদ্ধে শাস্তির বিধান রাখা এবং জামিন অযোগ্য ধারাগুলো বাদ দেওয়ার বিষয়টিও প্রশংসনীয় বলে মন্তব্য করেন তিনি।

কাদের গনি চৌধুরী বলেন, ‘বাক্‌স্বাধীনতার নামে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অসভ্যতা, ভুয়া আইডি দিয়ে নারী, শিশু এবং বিশিষ্ট ব্যক্তিদের অনলাইন হয়রানি কোনোভাবেই মতপ্রকাশের স্বাধীনতা হতে পারে না।’

তবে আইনের পাশাপাশি সরকারের কোনো সংস্থা নাগরিকদের সাইবার অধিকার লঙ্ঘন করলে তাদের জবাবদিহির বিধানও আইনে স্পষ্টভাবে রাখার প্রয়োজন বলে মত দেন তিনি।

ডেইলি স্টারের কনসাল্টিং এডিটর কামাল আহমেদ পরামর্শ সভার জন্য আরও পর্যাপ্ত সময় দেওয়ার আহ্বান জানান। তিনি আইনের প্রয়োগ ও সাজা বাড়ানোর চেয়ে এর অপব্যবহার রোধে কার্যকর ব্যবস্থা তৈরির ওপর গুরুত্ব দেন।

একই সঙ্গে মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে সরাসরি শাস্তির এখতিয়ার দেওয়ার ক্ষেত্রে যাতে আইনের অপপ্রয়োগ না হয়, সে বিষয়ে সতর্ক থাকার আহ্বান জানান তিনি।

সভায় আরও যারা ছিলেন

সভায় ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম, আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান, তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী ইয়াসের খান চৌধুরী এবং পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী-২ শামা ওবায়েদ ইসলাম বক্তব্য দেন।

এ ছাড়া প্রধানমন্ত্রীর ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তিবিষয়ক উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদ, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগের সচিব মো. মামুনুর রশীদ ভূঞাসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

সভায় অধ্যাপক ড. গীতি আরা নাসরীন, দৈনিক প্রতিদিনের বাংলাদেশ-এর সম্পাদক ও ন্যাশনাল এডিটরস কাউন্সিলের সদস্য মারুফ কামাল খান সোহেল, প্রথম আলোর নির্বাহী সম্পাদক সাজ্জাদ শরিফ, দৈনিক ওয়াদা সম্পাদক ও অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক প্রেস সচিব শফিকুল আলম, দৈনিক নয়া দিগন্তের নির্বাহী সম্পাদক মাসুমুর রহমান খলিলী, তথ্য অধিদপ্তরের প্রধান তথ্য কর্মকর্তা সৈয়দ আবদাল আহমদ, জাতীয় প্রেসক্লাবের সভাপতি কবি হাসান হাফিজসহ বিভিন্ন গণমাধ্যমের সম্পাদক, জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক ও শিক্ষাবিদেরা অংশ নেন।

অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের সচিব মাহবুবা ফারজানা। সভায় ‘সাইবার সুরক্ষা (সংশোধিত) আইন, ২০২৬’-এর খসড়া প্রস্তাব উপস্থাপন করেন জাতীয় সাইবার সুরক্ষা এজেন্সির মহাপরিচালক ড. মো. তৈয়বুর রহমান।

আরএস-রাসেল

০ মন্তব্য


কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!