জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে বাংলাদেশের সভাপতিত্বকে কাজে লাগিয়ে রোহিঙ্গা সংকটকে আবারও আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে আসা হবে বলে জানিয়েছেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির।
আজ বৃহস্পতিবার রাজধানীর ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে ‘দীর্ঘায়িত রোহিঙ্গা সংকট: সমন্বিত দৃষ্টিভঙ্গির সন্ধান’ শীর্ষক আন্তর্জাতিক সম্মেলন শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি এ কথা বলেন।
হুমায়ুন কবির বলেন, ‘জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে আমরা আমাদের অবস্থানকে কাজে লাগাব। এর মাধ্যমে জাতিসংঘের মতো বহুপক্ষীয় বৈশ্বিক মঞ্চে এই সংকটের গুরুত্ব নতুন করে তুলে ধরা হবে।’
তিনি বলেন, সংকটটি গুরুতর ও জটিল হলেও কূটনৈতিক উপায়ে এর সমাধানের বিষয়ে বাংলাদেশ আশাবাদী। এ জন্য দ্বিপক্ষীয় ও বহুপক্ষীয়—উভয় পর্যায়েই কূটনৈতিক তৎপরতা আরও জোরদার করা হবে।
রোহিঙ্গা ইস্যু আন্তর্জাতিক আলোচনায় ধরে রাখা, মানবিক সহায়তা অব্যাহত রাখা এবং একটি শান্তিপূর্ণ ও টেকসই সমাধানে পৌঁছাতে আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সঙ্গে একযোগে কাজ করবে বাংলাদেশ—এ কথা উল্লেখ করে প্রতিমন্ত্রী বলেন, লক্ষ্য হচ্ছে জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণভাবে মিয়ানমারের রাখাইনে নিজ ভূমিতে ফিরিয়ে দেওয়া।
প্রধান অংশীদারদের সঙ্গে আলোচনা
হুমায়ুন কবির বলেন, ‘রোহিঙ্গাদের ধাপে ধাপে স্বদেশে প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করতে এবং এই সংকটের স্থায়ী সমাধানের লক্ষ্যে আমরা দ্বিপক্ষীয় ও বহুপক্ষীয়—উভয় পর্যায়ে একসঙ্গে কাজ করব।’
মিয়ানমারে যেসব দেশের স্বার্থ ও প্রভাব রয়েছে, তাদের সঙ্গেও বাংলাদেশ আলোচনা করবে বলে জানান তিনি। এর মধ্যে চীন, আসিয়ানভুক্ত দেশগুলো, যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদি আরবের পাশাপাশি জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থা এবং অন্যান্য বহুপক্ষীয় প্রতিষ্ঠান রয়েছে।
এসব অংশীদারের অনেকেই বিভিন্ন সময়ে মানবিক সহায়তা দিয়েছেন এবং বাংলাদেশে রোহিঙ্গা শিবিরগুলোর কার্যক্রম সচল রাখতে আর্থিকভাবে অবদান রেখেছেন বলেও উল্লেখ করেন প্রতিমন্ত্রী।
তবে এই দীর্ঘদিনের সংকট সমাধানে নির্দিষ্ট কোনো সময়সীমা বেঁধে দেওয়া সম্ভব নয় বলে জানান তিনি। হুমায়ুন কবির বলেন, ‘এ ধরনের জটিল বিষয়ে হুট করে কোনো নির্দিষ্ট সময়সীমা নির্ধারণ করা যায় না। এখানে ধৈর্যের প্রয়োজন রয়েছে। তবে কূটনৈতিক পদক্ষেপ অত্যন্ত দ্রুত গতিতে চালাতে হবে।’
জাতীয় নিরাপত্তার সঙ্গেও সম্পর্কিত
প্রতিমন্ত্রী বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বর্তমান সরকার রোহিঙ্গা সংকট সমাধানকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিচ্ছে। কারণ, এই সমস্যার সঙ্গে বাংলাদেশের জাতীয় নিরাপত্তার গভীর সম্পর্ক রয়েছে।
তিনি বলেন, ‘আমরা কালই এই সমস্যার সমাধান করে ফেলব—এমন দাবি করছি না। তবে দ্রুত একটি বাস্তবসম্মত ও গ্রহণযোগ্য সমাধানের দিকে এগিয়ে যাওয়ার বিষয়ে আমরা আশাবাদী।’
হুমায়ুন কবির বলেন, নিজেদের সীমিত জমি ও সম্পদের ওপর প্রচণ্ড চাপ থাকা সত্ত্বেও নিপীড়িত রোহিঙ্গাদের প্রাণ বাঁচাতে কেবল মানবিক কারণে সীমান্ত খুলে দিয়েছিল বাংলাদেশ।
তার ভাষায়, রোহিঙ্গা সংকটকে শুধু বাংলাদেশের একার দায় হিসেবে দেখা উচিত নয়। এটি একটি বৈশ্বিক সমস্যা এবং এর দায়ভার আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কেও নিতে হবে।
আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে শুধু সহানুভূতি প্রকাশের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে আর্থিক সহায়তা বাড়ানোর আহ্বান জানান তিনি। একই সঙ্গে মিয়ানমারের সঙ্গে কূটনৈতিক ও নেপথ্য আলোচনায় আন্তর্জাতিক অংশীদারদের আরও সক্রিয়ভাবে যুক্ত হওয়ার আহ্বান জানান।
সংকট ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা
একটি টেকসই সমাধান খুঁজে পেতে ব্যর্থ হলে রোহিঙ্গা সংকটের প্রভাব বাংলাদেশের সীমানা ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে সতর্ক করেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী।
তিনি বলেন, দীর্ঘায়িত এই সংকট পুরো অঞ্চল এবং এর বাইরেও ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। তাই রোহিঙ্গাদের নিজ ভূমিতে নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসই প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে বাংলাদেশের পাশে দাঁড়াতে হবে।
এ জন্য দ্বিপক্ষীয় ও বহুপক্ষীয়—উভয় চ্যানেলে সমন্বিতভাবে কাজ করার আহ্বান জানান হুমায়ুন কবির।
আরএস-রাসেল
কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!