বগুড়ার দুপচাঁচিয়া উপজেলার তালোড়া বন্দর একসময় অ্যালুমিনিয়ামের তৈজসপত্রের জন্য সারা দেশে পরিচিত ছিল। ১৯৫৪ সালে এখানেই প্রতিষ্ঠিত হয় দেশের প্রথম অ্যালুমিনিয়াম তৈজসপত্রের কারখানা।
এরপর একে একে গড়ে ওঠে আরও কয়েকটি কারখানা। পাতিল, কড়াই, বালতি, মগসহ নানা ধরনের তৈজসপত্র তৈরি করে এসব প্রতিষ্ঠানের পণ্য ছড়িয়ে পড়ত উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন জেলার বাজারে।
সাত দশক পর সেই শিল্পই এখন অস্তিত্বের সংকটে পড়েছে। তালোড়ার ছোট-বড় ১১টি অ্যালুমিনিয়াম তৈজসপত্রের কারখানার মধ্যে গত চার বছরে বন্ধ হয়ে গেছে ১০টি। এতে কর্মহীন হয়েছেন পাঁচ শতাধিক শ্রমিক। চালু থাকা একমাত্র সৌরভ অ্যালুমিনিয়াম ওয়ার্কসও লোকসান দিয়ে কোনো রকমে টিকে আছে।
কারখানার মালিক ও শ্রমিকদের আশঙ্কা, দ্রুত জ্বালানি ও গ্যাস সমস্যার সমাধান না হলে শেষ কারখানাটিও বন্ধ হয়ে যেতে পারে।
গ্যাস না থাকায় উৎপাদন খরচ দ্বিগুণ
ব্যবসায়ীদের হিসাবে, ফার্নেস অয়েল ব্যবহার করে এক কেজি অ্যালুমিনিয়ামের তৈজসপত্র উৎপাদনে খরচ হয় প্রায় ১৬ টাকা। একই পণ্য গ্যাসে উৎপাদন করা গেলে খরচ নেমে আসে ৮ থেকে ৯ টাকায়।
বগুড়া শহরের শিল্পকারখানাগুলো গ্যাস-সুবিধা পাওয়ায় সেখানকার উদ্যোক্তারা তুলনামূলক কম খরচে পণ্য উৎপাদন করতে পারছেন। অথচ শহর থেকে মাত্র ২০ কিলোমিটার দূরের তালোড়ায় এখনো গ্যাস সংযোগ নেই।
ফলে একই বাজারে পণ্য বিক্রি করেও তালোড়ার উদ্যোক্তাদের উৎপাদন খরচ বেশি হচ্ছে। প্রতিযোগিতায় টিকতে না পেরে একের পর এক কারখানা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে।
‘মাস গেলেই লোকসান’
তালোড়ার সৌরভ অ্যালুমিনিয়াম ওয়ার্কসের সেলস ম্যান বীরেন চন্দ্র প্রায় ২৫ বছর ধরে কারখানাটিতে কাজ করছেন। কারখানা চালুর সময় থেকেই তিনি সেখানে রয়েছেন।
বীরেন চন্দ্র বলেন, আগে ফার্নেস অয়েল, অ্যাসিড, সালফার, কস্টিক ও নাইট্রিকসহ বিভিন্ন কাঁচামালের দাম তুলনামূলক কম ছিল। এখন এসবের দাম কয়েক গুণ বেড়েছে। কিন্তু সে অনুযায়ী অ্যালুমিনিয়ামের তৈজসপত্রের দাম বাড়ানো সম্ভব হয়নি।
তিনি জানান, আগে সালফারের দাম ছিল প্রায় ২ হাজার টাকা, এখন তা বেড়ে হয়েছে ১২ হাজার টাকা। নাইট্রিকের দাম ২ হাজার ৫০০ টাকা থেকে বেড়ে হয়েছে প্রায় ৫ হাজার ৫০০ টাকা। কস্টিকের দামও ২ থেকে আড়াই হাজার টাকা থেকে বেড়ে প্রায় সাড়ে ৪ হাজার টাকা হয়েছে।
বীরেন চন্দ্র বলেন, ব্যবসাটি মূলত বিনিময়ভিত্তিক। আগে ১০০ কেজি ভাঙারির বিপরীতে ৬২ থেকে ৬৩ কেজি পণ্য দিতে হতো। এখন কাঁচামালের দাম বেড়ে যাওয়ায় একই পরিমাণ ভাঙারির বিপরীতে ৬৮ থেকে ৬৯ কেজি পণ্য দিতে হচ্ছে। এতে উৎপাদন খরচ আরও বেড়েছে।
তাঁর ভাষায়, তালোড়ার পাঁচটি কারখানার মধ্যে চারটিই বন্ধ হয়ে গেছে। এখন একটি কারখানা কোনো রকমে চলছে। একদিন গালাই উৎপাদন হয়, অন্যদিন হয় না। কাঁচামালের সংকট রয়েছে, আর মাস গেলেই লোকসান হচ্ছে।
অনিয়মিত কাজ, সংসারে টানাপোড়েন
কারখানার শ্রমিক রতন মিয়ার সংসারও এখন অনিয়মিত কাজের ওপর নির্ভরশীল। তিনি বলেন, একদিন মেশিন চলে, অন্যদিন চলে না। বিদ্যুৎ ও জ্বালানির সমস্যা থাকায় নিয়মিত কাজ করা সম্ভব হয় না। কোম্পানিও চাহিদা অনুযায়ী পণ্য সরবরাহ করতে পারে না।
রতন মিয়া বলেন, আগে সংসার ভালোভাবে চলত। এখন সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে। সরকার গ্যাস বা জ্বালানির ব্যবস্থা করলে বন্ধ হয়ে যাওয়া আরও কয়েকটি কারখানা চালু হতে পারে।
দুই বছর আগে বন্ধ হয়ে যাওয়া প্রগতি অ্যালুমিনিয়ামের মালিকও জানান, জ্বালানি সংকটের কারণে কারখানাটি চালু রাখা সম্ভব হয়নি। বগুড়া বিসিক শিল্পনগরীতে প্লট না পাওয়ায় অন্যত্র সরিয়েও নিতে পারেননি তিনি।
কাঁচামাল ও জ্বালানি সংকট
তালোড়া অ্যালুমিনিয়ামের মালিক পবন প্রসাদ পোদ্দারের অভিযোগ, উপজেলা পর্যায়ের কারখানাগুলোতে গ্যাস সংযোগ দেওয়ার বিষয়ে সরকারের অনাগ্রহের কারণে অনেক কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। এতে শত শত শ্রমিক কাজ হারিয়েছেন।
চালু থাকা একমাত্র সৌরভ অ্যালুমিনিয়াম ওয়ার্কসের মালিক সুভাষ প্রসাদ কানু বলেন, ফার্নেস অয়েলে এক মাসে যে পরিমাণ খরচ হয়, তা দিয়ে ছয়-সাত মাসের গ্যাসের বিল দেওয়া সম্ভব। গ্যাস সংযোগ পেলে উৎপাদন দ্বিগুণ করা যাবে এবং উৎপাদন খরচও অনেক কমবে।
তিনি জানান, শহর এলাকায় গ্যাস সংযোগ দেওয়ার পর প্রায় চার বছর আগে জেলা প্রশাসকের কাছে গ্যাস সংযোগের দাবিতে স্মারকলিপি দেওয়া হয়েছিল। তবে এখনো সেই দাবি বাস্তবায়িত হয়নি।
বন্ধ হয়ে যাওয়া মন্ডল অ্যালুমিনিয়ামের ব্যবস্থাপক আফজাল হোসেন বলেন, একসময় তালোড়ার কারখানায় তৈরি অ্যালুমিনিয়ামের পাতিলসহ বিভিন্ন পণ্য দেশের বিভিন্ন জেলায় যেত। কিন্তু কাঁচামাল, জ্বালানি ও অর্থনৈতিক সংকটের পাশাপাশি গ্যাস না থাকায় কারখানাটি বন্ধ হয়ে যায়। একপর্যায়ে মালিকের দেনা হয়ে গেলে কারখানাটি বিক্রি করে দিতে হয়।
শিল্প টিকিয়ে রাখার আশ্বাস
বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশন (বিসিক), বগুড়া জেলা কার্যালয়ের উপমহাব্যবস্থাপক এ কে এম মাহফুজুর রহমান বলেন, অ্যালুমিনিয়াম শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে উদ্যোক্তাদের প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা দেওয়া জরুরি। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলে উদ্যোক্তাদের কীভাবে সহযোগিতা করা যায়, সে বিষয়ে আলোচনা করা হবে।
বগুড়ার জেলা প্রশাসক তৌফিকুর রহমান বলেন, যেসব রুগ্ণ শিল্প রয়েছে, সেগুলোকে শক্তিশালী করার উদ্যোগ নেওয়া হবে। কোনো শিল্প বিলুপ্ত হওয়ার পথে থাকলে এবং সেটির সম্ভাবনা থাকলে সরকারি সহযোগিতায় তা বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা করা হবে। কারণ এসব শিল্পে অনেক মানুষের কর্মসংস্থান রয়েছে।
তিনি বলেন, অ্যালুমিনিয়াম শিল্প বগুড়ার একসময়কার ঐতিহ্য। ধীরে ধীরে এই শিল্পের সংখ্যা কমে গেছে। শিল্পের সঙ্গে যুক্ত উদ্যোক্তা ও শ্রমিকদের সহযোগিতার বিষয়ে প্রশাসনের পক্ষ থেকে উদ্যোগ নেওয়া হবে।
জেলা প্রশাসক আরও বলেন, বিভিন্ন ধরনের ঋণসুবিধা রয়েছে। উদ্যোক্তারা প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগ করলে ঋণসুবিধা নিশ্চিত করার বিষয়ে সহযোগিতা করা হবে। ঐতিহ্যবাহী এই শিল্পকে কীভাবে আবার পুনরুজ্জীবিত করা যায়, সে বিষয়েও উদ্যোগ নেওয়ার চেষ্টা করা হবে।
শেষ কারখানাটিও কি বন্ধ হয়ে যাবে?
তালোড়ার অ্যালুমিনিয়াম শিল্পের সংকট শুধু কয়েকটি কারখানা বন্ধ হওয়ার ঘটনা নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে পাঁচ শতাধিক শ্রমিকের কর্মসংস্থান, বহু পরিবারের জীবিকা এবং একটি এলাকার দীর্ঘদিনের শিল্প ঐতিহ্য।
ব্যবসায়ীদের দাবি, গ্যাস সংযোগ, নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ, কাঁচামালের দাম নিয়ন্ত্রণ এবং সহজ শর্তে ঋণসুবিধা নিশ্চিত করা গেলে বন্ধ হয়ে যাওয়া অনেক কারখানাই আবার চালু করা সম্ভব।
কিন্তু দ্রুত উদ্যোগ না নিলে তালোড়ার অ্যালুমিনিয়াম শিল্পের শেষ আলোটিও নিভে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। ১৯৫৪ সালে যে শিল্পের হাত ধরে তালোড়ার পরিচিতি তৈরি হয়েছিল, সাত দশক পর সেই শিল্পই এখন টিকে থাকার লড়াইয়ে।
আরএস-রাসেল
কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!