ঢাকা, ১৬ সেপ্টেম্বর: রাজধানীর মোহাম্মদপুর হাউজিং এস্টেটের ডি-টাইপ কলোনির ২৮৮টি ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের পুনর্বাসন, আদালতের আদেশ বাস্তবায়ন এবং ফ্ল্যাট বরাদ্দে অনিয়মের অভিযোগ তদন্তসহ সাত দফা দাবি জানিয়েছে ডি-টাইপ কলোনি কল্যাণ সমিতি।
বুধবার এক সংবাদ সম্মেলনে সংগঠনটির নেতারা এসব দাবি জানান। তারা বলেন, দীর্ঘদিন ধরে বসবাস করে আসা ২৮৮টি পরিবারকে নতুন আবাসন প্রকল্পে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে পুনর্বাসনের আশ্বাস দেওয়া হলেও পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন জটিলতা তৈরি হয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে বলা হয়, ১৯৬০ সালে জাতিসংঘের তত্ত্বাবধানে এবং একটি জার্মান এনজিওর সহায়তায় মোহাম্মদপুর ডি-টাইপ কলোনিতে ২৮৮টি পরিবারকে পুনর্বাসন করা হয়। আটটি ভবনের প্রায় ২০০ বর্গফুটের ফ্ল্যাটে পাঁচ যুগেরও বেশি সময় ধরে এসব পরিবার বসবাস করে আসছে। এসব ঠিকানা জাতীয় পরিচয়পত্র, জন্মনিবন্ধন ও পাসপোর্টসহ বিভিন্ন সরকারি নথিতে ব্যবহৃত হয়ে আসছে বলেও তারা জানান।
সংগঠনটির দাবি, ২০১৯ সালে ‘কনকচাঁপা’ ও ‘দোলনচাঁপা’ নামে ৪৩০টি নতুন ফ্ল্যাট নির্মাণের প্রকল্প নেওয়া হলে জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষ (জাগৃক) পুরোনো ভবনের ক্ষতিগ্রস্ত ২৮৮টি পরিবারকে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে পুনর্বাসনের আশ্বাস দেয়। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর চাহিদা পূরণের পর অবশিষ্ট ফ্ল্যাট বিক্রির কথা বলা হয়েছিল বলেও সংবাদ সম্মেলনে দাবি করা হয়।
তবে পরবর্তীতে ফ্ল্যাট বরাদ্দ ও যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়ায় অনিয়ম হয়েছে বলে অভিযোগ করেন কলোনির বাসিন্দারা। তাদের দাবি, হাইকোর্টের রিট পিটিশন নং ৭৬৪১/২০২১ ও ১৮৩২৮/২০২৫-এর রায়/আদেশের পরও বিভিন্ন শর্ত পরিবর্তন করা হয়েছে। বকেয়া ভাড়া ও ইউটিলিটি বিল পরিশোধের জন্য নির্বাহী প্রকৌশলীর প্রত্যয়নপত্র জমা দেওয়া এবং জামানতসহ প্রতিটি পরিবারকে ৬ থেকে ৮ লাখ টাকা পর্যন্ত ব্যয় করতে হয়েছে বলেও তারা জানান।
সংবাদ সম্মেলনে আরও দাবি করা হয়, ২৫৭টি আবেদনের মধ্যে ১২৭টি আবেদনকে ‘অবৈধ’ ঘোষণা করে বাদ দেওয়া হয়েছে। এছাড়া মূল ২৮৮টি নথির মধ্যে ১১৫টি নথি পাওয়া যাচ্ছে না বলেও অভিযোগ করেন তারা।
ফ্ল্যাট বরাদ্দের ক্ষেত্রেও অনিয়মের অভিযোগ তুলে সংগঠনটি জানায়, সংরক্ষিত কোটায় ৫২টি, গ্রেডেশনে ৫৬টি এবং লটারির মাধ্যমে ৫৬টিসহ মোট ১৬৫টি ফ্ল্যাট বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর জন্য প্রতি বর্গফুট ৬ হাজার ৫৫৫ টাকা মূল্য নির্ধারণ এবং কিস্তি পরিশোধের সময়সীমা আট বছর থেকে কমিয়ে চার বছর করা হয়েছে বলেও তারা অভিযোগ করেন।
এ ছাড়া জাগৃকের তৎকালীন চেয়ারম্যানের নামে নিয়মবহির্ভূতভাবে ফ্ল্যাট বরাদ্দ এবং চার কর্মকর্তার লটারি ছাড়া একাধিক ফ্ল্যাট ও গ্যারেজ দখলে নেওয়ার অভিযোগও সংবাদ সম্মেলনে তুলে ধরা হয়। ভবন ভাঙার সময় আনুমানিক দুই কোটি টাকার সরঞ্জাম আত্মসাতের অভিযোগ রয়েছে বলেও সংগঠনটির পক্ষ থেকে দাবি করা হয়।
তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের কোনো বক্তব্য সংবাদ সম্মেলনে দেওয়া হয়নি।
সংগঠনটির নেতারা জানান, আগস্টের শেষ দিকে মানববন্ধন কর্মসূচির পর সেপ্টেম্বরের প্রথম সপ্তাহে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের সচিবের নির্দেশে তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তারা তদন্ত প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত এবং নিরপেক্ষ যাচাই-বাছাইয়ের দাবি জানান।
সংবাদ সম্মেলনে ডি-টাইপ কলোনি কল্যাণ সমিতির পক্ষ থেকে সাত দফা দাবি তুলে ধরা হয়। দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে আদালতের রায়/আদেশ বাস্তবায়ন ও বিতর্কিত কমিটি বাতিল করে নতুন স্বাধীন যাচাই-বাছাই কমিটি গঠন, ২৮৮টি পরিবারের জন্য ২৮৮টি ফ্ল্যাটের মাধ্যমে পূর্ণাঙ্গ পুনর্বাসন, মানবিক কিস্তি সুবিধা ও দ্রুত ফ্ল্যাট হস্তান্তর, বাদ পড়া ৩৫টি পরিবারকে পুনরায় আবেদনের সুযোগ দেওয়া, দোলনচাঁপা প্রকল্পে ভবনভিত্তিক বৈষম্য দূর করা, কনকচাঁপায় অতিরিক্ত তিনটি লিফট স্থাপন এবং বাইতুস সুজুদ জামে মসজিদকে প্রকল্পের স্থায়ী অংশ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা।
এর মধ্যে চারটি দাবিকে অগ্রাধিকার হিসেবে উল্লেখ করা হয়। এগুলো হলো—রিট পিটিশন নং ৭৬৪১/২০২১ ও ১৮৩২৮/২০২৫-এর রায়/আদেশ বাস্তবায়ন, ২৮৮টি ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের জন্য ২৮৮টি ফ্ল্যাটের মাধ্যমে পুনর্বাসন, বিতর্কিত বা অযোগ্য বরাদ্দের বিষয়ে নিরপেক্ষ তদন্ত ও যাচাই এবং জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের বরাদ্দ ও যাচাই প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা।
সংগঠনটির সভাপতি মরগুব আহমেদ নাজম উদ্দীন ও সাধারণ সম্পাদক খন্দকার আনোয়ার কামাল সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন। তারা বলেন, ২৮৮টি পরিবারের দীর্ঘদিনের আবাসন সংকটের স্থায়ী সমাধান এবং আইনগত অধিকার নিশ্চিত করাই তাদের প্রধান লক্ষ্য।
কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!