ফ্যাটি লিভার সাধারণত অতিরিক্ত ওজনের সঙ্গে সম্পর্কিত হলেও যেকোনো শারীরিক গঠনের মানুষেরই এ সমস্যা হতে পারে। তবে রোগটি প্রাথমিক পর্যায়ে থাকলে খাদ্যাভ্যাস, শারীরিক কার্যকলাপ ও ওজন নিয়ন্ত্রণের মতো জীবনযাপনের পরিবর্তনের মাধ্যমে লিভারে জমে থাকা চর্বি কমানো এবং অবস্থার উন্নতি করা সম্ভব হতে পারে।
ফ্যাটি লিভারকে বর্তমানে অনেক ক্ষেত্রে মেটাবলিক ডিসফাংশন-অ্যাসোসিয়েটেড স্টিয়াটোটিক লিভার ডিজিজ (MASLD) বলা হয়। লিভারে অতিরিক্ত চর্বি জমার এই অবস্থার সঙ্গে ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স, টাইপ-২ ডায়াবেটিস, উচ্চ কোলেস্টেরল, উচ্চ রক্তচাপ ও পেটের অতিরিক্ত চর্বির মতো বিপাকীয় সমস্যার সম্পর্ক রয়েছে।
তবে ফ্যাটি লিভার নিয়ন্ত্রণের জন্য দ্রুত ওজন কমানো বা তথাকথিত ‘ডিটক্স’ ডায়েট অনুসরণ করার প্রয়োজন নেই। বরং দীর্ঘমেয়াদে ধরে রাখা যায়—এমন স্বাস্থ্যকর অভ্যাস গড়ে তোলাই গুরুত্বপূর্ণ।
ওজন কমাতে হবে কতটা?
শরীরের ওজন ৩ থেকে ৫ শতাংশ কমাতে পারলে লিভারে জমে থাকা চর্বি কমতে পারে। অতিরিক্ত ওজন বা স্থূলতা থাকলে প্রায় ৭ থেকে ১০ শতাংশ ওজন কমানো লিভারের প্রদাহ ও ফাইব্রোসিসের উন্নতিতে সহায়ক হতে পারে।
তবে ওজন কমানোই একমাত্র বিষয় নয়। নিয়মিত শারীরিক কার্যকলাপ ওজন না কমলেও লিভারের জন্য উপকারী হতে পারে।
অতিরিক্ত ওজন থাকলে কঠোর ডায়েটের পরিবর্তে খাবারের পরিমাণ নিয়ন্ত্রণ, উচ্চ ক্যালরিযুক্ত খাবার ও পানীয় কমানো এবং দৈনন্দিন শারীরিক কার্যকলাপ বাড়ানোর দিকে মনোযোগ দেওয়া যেতে পারে। দ্রুত ওজন কমানোর ‘ক্র্যাশ ডায়েট’ দীর্ঘমেয়াদে ধরে রাখা কঠিন।
আবার যাদের ওজন স্বাভাবিক, তাদেরও ফ্যাটি লিভার হতে পারে। এ ক্ষেত্রে শুধু ওজন কমানোর পরিবর্তে সামগ্রিক বিপাকীয় স্বাস্থ্য ভালো রাখার দিকে নজর দেওয়া জরুরি।
চিনি ও পরিশোধিত শর্করা কমান
চিনি, চিনিযুক্ত পানীয় ও পরিশোধিত শর্করা বেশি থাকা খাবার অতিরিক্ত ক্যালরি গ্রহণ ও বিপাকীয় সমস্যার সঙ্গে যুক্ত হতে পারে। সফট ড্রিঙ্কস, মিষ্টি জুস, মিষ্টি, বিস্কুট, কেক ও অতিরিক্ত প্রক্রিয়াজাত খাবার কম খাওয়া ভালো।
এর পরিবর্তে শাকসবজি, গোটা শস্য, ডাল, শিম, বাদাম ও গোটা ফলের মতো আঁশ ও পুষ্টিসমৃদ্ধ খাবার খাদ্যতালিকায় রাখা যেতে পারে। শর্করা পুরোপুরি বাদ দেওয়ার প্রয়োজন নেই; বরং এর পরিমাণ ও ধরন গুরুত্বপূর্ণ।
সব ধরনের চর্বি বাদ দেওয়ার প্রয়োজন নেই
ফ্যাটি লিভার হলে সব ধরনের চর্বিযুক্ত খাবার বন্ধ করার প্রয়োজন নেই। স্যাচুরেটেড ও ট্রান্স ফ্যাট কমিয়ে বাদাম, বীজ, মাছ ও উদ্ভিজ্জ তেলের মতো আনস্যাচুরেটেড ফ্যাট পরিমিত পরিমাণে খাওয়া যেতে পারে। ভাজাপোড়া ও অতিরিক্ত স্যাচুরেটেড ফ্যাটযুক্ত খাবার সীমিত করা ভালো।
নিয়মিত শরীরচর্চা
দ্রুত হাঁটা, সাইকেল চালানো, সাঁতার বা জগিংয়ের মতো অ্যারোবিক ব্যায়াম নিয়মিত করলে বিপাকীয় স্বাস্থ্যের উন্নতির পাশাপাশি লিভারে জমে থাকা চর্বি কমাতে সহায়তা করতে পারে। শক্তি প্রশিক্ষণও পেশি তৈরি ও ধরে রাখতে সাহায্য করে।
শুরুতেই কঠিন ব্যায়াম করার প্রয়োজন নেই। বরং নিজের সক্ষমতা অনুযায়ী ধীরে ধীরে দৈনন্দিন চলাফেরা ও ব্যায়ামের পরিমাণ বাড়ানো এবং নিয়মিত করা যায়—এমন কার্যক্রম বেছে নেওয়া ভালো।
ডায়াবেটিস, কোলেস্টেরল ও রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখুন
ফ্যাটি লিভারের সঙ্গে বিপাকীয় স্বাস্থ্যের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। রক্তে শর্করা বেশি থাকা, ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স, অস্বাভাবিক কোলেস্টেরল ও উচ্চ রক্তচাপ লিভারের রোগের অগ্রগতির ঝুঁকি বাড়াতে পারে। তাই শুধু খাবারের দিকে নজর দিলেই হবে না; এসব সমস্যাও নিয়ন্ত্রণে রাখা জরুরি।
কিছু ক্ষেত্রে ডায়াবেটিস, কোলেস্টেরল বা অন্য সমস্যার জন্য চিকিৎসকের পরামর্শে ওষুধের প্রয়োজন হতে পারে। ওষুধ গ্রহণের পাশাপাশি স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন চালিয়ে যাওয়া যায়।
ফ্যাটি লিভার থাকলে রোগের মাত্রা ও লিভারের অবস্থা জানতে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ। ব্যক্তিভেদে চিকিৎসা ও জীবনযাপনের পরিবর্তনের প্রয়োজনও ভিন্ন হতে পারে।
আরএস-রাসেল
কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!