দেশের চলমান সংকটকে পুঁজি করে কিছু রাজনৈতিক দল ও ব্যক্তি বিভ্রান্তি ছড়িয়ে অরাজকতা সৃষ্টির চেষ্টা করছে বলে অভিযোগ করেছেন প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান।
তিনি বলেছেন, সরকার উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া এবং অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের রেখে যাওয়া বিভিন্ন সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করছে। তবে এসব সমস্যাকে কেন্দ্র করে কেউ অরাজকতা সৃষ্টির চেষ্টা করলে তা নিয়ন্ত্রণে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
আজ শনিবার বিকেলে রাজধানীর কৃষিবিদ ইনস্টিটিউট মিলনায়তনে বিএনপির ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন।
‘করব কাজ, গড়ব দেশ, সবার আগে বাংলাদেশ’ স্লোগানে আয়োজিত এ আলোচনা সভা বিকেল পৌনে চারটায় পবিত্র কোরআন তিলাওয়াতের মধ্য দিয়ে শুরু হয়।
তারেক রহমান বলেন, ‘গত কিছুদিন ধরে খেয়াল করছি, যেসব সমস্যা আমরা ইনহেরিট করেছি, স্বৈরাচার আমলেই হোক অথবা অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের রেখে যাওয়া সমস্যাই হোক না কেন, সবগুলোই সমাধানের চেষ্টা করছি।’
দেশে সমস্যা রয়েছে—এ কথা স্বীকার করে তিনি বলেন, এসব সমস্যাকে পুঁজি করে কিছু রাজনৈতিক দল ও ব্যক্তি বিভিন্নভাবে বিভ্রান্তি সৃষ্টির চেষ্টা করছেন। এর মাধ্যমে দেশে অরাজকতা তৈরির চেষ্টা করা হচ্ছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
সরকারের অবস্থান তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, জনগণ সরকারকে দেশ পরিচালনার দায়িত্ব দিয়েছে। গণতন্ত্রের ধারাকে সমুন্নত রাখা এবং গণতান্ত্রিক নীতি-নৈতিকতা অনুসরণে সরকার সর্বোচ্চ চেষ্টা করবে।
কেউ অরাজকতা সৃষ্টির চেষ্টা করলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘কেউ যদি অরাজকতা সৃষ্টি করতে চায়; সেটিকে কীভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে তা দেশের আইনে বলে দেওয়া আছে। কাজেই জনগণের দ্বারা নির্বাচিত সরকার হিসেবে পরিষ্কারভাবে বলতে চাই, প্রত্যেকের নিজেদের সীমার মধ্যে থাকা দরকার।’
জ্বালানি সংকট নিয়ে দুঃখ প্রকাশ
দেশে বিভিন্ন সংকটের সময়ে বিএনপি জনগণের পাশে ছিল দাবি করে তারেক রহমান বলেন, প্রতিটি সংকটকালীন সময়ে দলটির নেতা-কর্মীরা দেশের মানুষের সঙ্গে থেকে সংকট মোকাবিলায় কাজ করেছেন।
বর্তমানে বিএনপি সরকার পরিচালনার দায়িত্বে থাকায় বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকটে থাকা সাধারণ মানুষ ও শিল্পকারখানার মালিকদের কাছে দলের পক্ষ থেকে দুঃখ প্রকাশ করেন তিনি।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, আগামী দিনে যেন দেশের মানুষকে জ্বালানি সংকটে পড়তে না হয়, সে অনুযায়ী কর্মপরিকল্পনা তৈরি করছে বিএনপি।
‘গুপ্ত’ রাজনীতি নিয়ে প্রশ্ন
স্বৈরাচারী শাসনামলে কিছু রাজনৈতিক দল ‘গুপ্ত’ অবস্থান নিয়েছিল দাবি করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, তারা স্বৈরাচারের ভেতরে লুকিয়ে ছিল। পরবর্তী সময়ে ওই দলের কিছু লোক নিজেদের অবস্থান স্বীকার করেছেন বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
তারেক রহমান বলেন, এমনও হতে পারে, আগে যারা স্বৈরাচারের আড়ালে লুকিয়ে ছিল, এখন তাদের ভেতরে স্বৈরাচারীরা লুকিয়ে থেকে অরাজকতা উসকে দেওয়ার চেষ্টা করছে।
তিনি বিএনপির নেতা-কর্মীদের জনগণকে সচেতন করার আহ্বান জানিয়ে বলেন, কারা কাকে আড়াল করছে বা কারা কাকে সামনে আনার চেষ্টা করছে, তা জনগণের সামনে তুলে ধরতে হবে।
‘মানবিক রাষ্ট্র’ গড়ার প্রত্যয়
বিএনপিকে জনগণের স্বার্থ রক্ষাকারী রাজনৈতিক দল হিসেবে উল্লেখ করে তারেক রহমান বলেন, জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকার নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে বিএনপির ভূমিকা রয়েছে। এ কারণেই বিভিন্ন নির্বাচনে দলটি জনগণের সমর্থন নিয়ে সরকার গঠন করতে পেরেছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
তিনি বলেন, এখন এমন একটি মানবিক রাষ্ট্র গড়ে তুলতে চান, যেখানে প্রতিটি নাগরিকের অধিকার নিশ্চিত থাকবে।
বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমান ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়াকে স্মরণ করে তারেক রহমান বলেন, বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা থেকে বহুদলীয় গণতন্ত্রের পুনঃপ্রবর্তন, রেমিট্যান্স ও তৈরি পোশাকশিল্পের বিকাশ এবং নারীদের অবৈতনিক শিক্ষা চালুর ক্ষেত্রে তাঁদের ও বিএনপির ভূমিকা রয়েছে।
খালেদা জিয়ার সময়ে সংসদীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা এবং নির্দলীয় নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা প্রবর্তনের কথাও উল্লেখ করেন তিনি।
‘২০২৪ সালের আন্দোলনের কৃতিত্ব জনগণের’
দেশের বিভিন্ন সংকট মোকাবিলায় বিএনপির ভূমিকার কথা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ১৯৭৫ সালের পর খাদ্য উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন এবং নব্বইয়ের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের পর অর্থনীতি পুনর্গঠনে বিএনপির ভূমিকা ছিল।
গত ১৬-১৭ বছরে বিএনপি নেতা-কর্মীরা বিভিন্ন অন্যায়, অত্যাচার ও নির্যাতনের মধ্যেও রাজপথে আন্দোলন চালিয়ে গেছেন বলে দাবি করেন তিনি।
২০২৪ সালের আন্দোলন প্রসঙ্গে তারেক রহমান বলেন, ওই আন্দোলনের মূল ‘মাস্টারমাইন্ড’ এবং সফলতার পূর্ণ কৃতিত্ব দেশের সাধারণ মানুষের। বিএনপি জনগণের সঙ্গে থেকে সেই আন্দোলন সফল করেছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
আলোচনা সভায় যাঁরা ছিলেন
বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভীর সভাপতিত্বে আলোচনা সভায় বক্তব্য দেন অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক মাহবুব উল্লাহ, দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস, আমানউল্লাহ আমান, ফরহাদ হালিম ও ইসমাইল জবিউল্লাহ।
সভায় আরও বক্তব্য দেন যুবদলের সভাপতি এম মোনায়েম মুন্না, কৃষক দলের সাধারণ সম্পাদক শহিদুল ইসলাম বাবুল, স্বেচ্ছাসেবক দলের সাধারণ সম্পাদক রাজীব আহসান, ঢাকা মহানগর বিএনপি দক্ষিণের সদস্যসচিব তানভীর আহমেদ রবিন, উত্তরের সদস্যসচিব মোস্তফা জামান এবং ছাত্রদলের সভাপতি রাকিবুল ইসলাম রাকিব।
দলের কেন্দ্রীয় প্রচার সম্পাদক ও মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী সুলতান সালাউদ্দিন টুকু সভা সঞ্চালনা করেন।
অনুষ্ঠানে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, আবদুল মঈন খান, আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, সালাহউদ্দিন আহমদ, সেলিমা রহমান ও এ জেড এম জাহিদ হোসেনসহ কেন্দ্রীয় নেতারা উপস্থিত ছিলেন।
আলোচনার শুরুতে বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমান, দলের সাবেক চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া এবং বিভিন্ন সময়ে নিহত নেতা-কর্মীদের স্মরণে এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয়। পরে জাতীয় সংগীত ও দলীয় সংগীত পরিবেশন করা হয় এবং বিএনপির ওপর নির্মিত একটি প্রামাণ্যচিত্র প্রদর্শন করা হয়।
১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান বিএনপি প্রতিষ্ঠা করেন। প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে গত মঙ্গলবার থেকে পাঁচ দিনের কেন্দ্রীয় কর্মসূচি শুরু হয়। শনিবারের আলোচনা সভার মধ্য দিয়ে কর্মসূচি শেষ হয়।
আরএস-রাসেল
কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!