যুক্তরাষ্ট্র   মঙ্গলবার ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, মঙ্গলবার ১৩ আশ্বিন ১৪৩৩

ক্ষণিকের দেখায় গড়ে উঠেছে এক আত্মিক বন্ধন

এখন বাংলা ডেস্ক

প্রকাশিত: ০৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৫:০১ AM

৩২
ক্ষণিকের দেখায় গড়ে উঠেছে এক আত্মিক বন্ধন

রোদ-বৃষ্টি কিংবা গভীর রাত—প্রতিদিন নির্দিষ্ট কিছু সময়ে রাজধানীর কয়েকটি সড়কের পাশে একই জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায় কিছু মানুষকে। তাঁদের অপেক্ষা একজনকে একনজর দেখার জন্য। কখন তাঁর গাড়ি ওই পথ দিয়ে যাবে, তা নিশ্চিতভাবে জানা নেই। তবু নিয়মিত যাতায়াতের সময়ের সঙ্গে মিলিয়ে তাঁরা দাঁড়িয়ে থাকেন রাস্তার পাশে।

কেউ রিকশার হ্যান্ডেলে হাত রেখে অপেক্ষা করেন, কেউ দোকানের সামনে, কেউবা ফুটপাতে। কেউ আবার কাজের ফাঁকে এসে দাঁড়ান। গাড়িবহর কাছাকাছি এলে তাঁরা হাত নেড়ে শুভেচ্ছা জানান। গাড়ির ভেতর থেকেও হাত তুলে তাঁদের অভিবাদনের জবাব দেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। কয়েক সেকেন্ডের এই দেখা যেন নিয়মিত অপেক্ষমাণ মানুষগুলোর কাছে দিনের একটি বিশেষ মুহূর্ত হয়ে উঠেছে।

প্রধানমন্ত্রীর অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমন এসব মানুষের কয়েকজনের কথা তুলে ধরেছেন।

রমনা থানার পাশে যমুনা ব্যাংকের একটি এটিএম বুথে নিরাপত্তাকর্মী হিসেবে কাজ করতেন পাবনার এক বৃদ্ধ। প্রধানমন্ত্রীর গাড়ি ওই পথ দিয়ে যাওয়ার সময় হাতে ধানের শীষ নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতেন তিনি। গাড়ি এলে একনজর দেখতেন, হাত নেড়ে অভিবাদন জানাতেন। এরপর নাশতা করে কাজে যোগ দিতেন।

এখন এটিএম বুথটি স্থায়ীভাবে বন্ধ। চাকরিও নেই তাঁর। কিন্তু অপেক্ষার অভ্যাসটি বদলায়নি। প্রতিদিন নিরাপত্তাকর্মীর পুরোনো ইউনিফর্ম পরে, হাতে ধানের শীষ নিয়ে তিনি চলে আসেন সেই জায়গায়। কিছুক্ষণ পর গাড়িবহর আসে। কয়েক সেকেন্ডের দেখা শেষ হলে তিনি ফিরে যান। দীর্ঘ সময়ের অপেক্ষার বিনিময়ে পাওয়া ওই মুহূর্তটুকুই যেন তাঁর কাছে যথেষ্ট।

আতিকুর রহমান রুমন জানান, বনানীর দুবাই মার্কেটের কাছেও নিয়মিত অপেক্ষা করেন দুজন রিকশাচালক। জীবিকার ব্যস্ততার মধ্যেও প্রধানমন্ত্রীর গাড়ি যাওয়ার সময় তাঁরা রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকেন। গাড়ি কাছে এলে হাত নেড়ে শুভেচ্ছা জানান।

বনানী কাঁচাবাজারের কাছেও এমন কিছু পরিচিত মুখ রয়েছে। ফুল ও ফল বিক্রেতা, ফুটপাতের হকারদের কেউ কেউ কাজ থামিয়ে দাঁড়িয়ে থাকেন। তাঁদের অপেক্ষা এক ঝলক দেখার জন্য। গাড়ি চলে যাওয়ার পর আবার তাঁরা নিজেদের কাজে ফিরে যান।

রাতে কামাল আতাতুর্ক রোডেও এমন একজন অপেক্ষা করেন। প্রধানমন্ত্রীর বাড়ি ফেরার সময় কখনো তাঁর অপেক্ষা গভীর রাত পর্যন্ত গড়ায়। দিনের পর দিন একই জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকায় মুখটি এখন পরিচিত হয়ে গেছে। গাড়িবহর সেখানে পৌঁছালে গতি কিছুটা কমে আসে। গাড়ির ভেতরের আলো জ্বালিয়ে হাত নেড়ে ওই ব্যক্তির অভিবাদনের জবাব দেন প্রধানমন্ত্রী।

গুলশান-২-এর প্রধান সড়ক থেকে গলির ভেতরের রেস্তোরাঁ ও হোটেলের অনেক কর্মচারীও রাতে প্রধানমন্ত্রীর ফেরার অপেক্ষায় থাকেন। তাঁদের কাছাকাছি এলে প্রধানমন্ত্রী গাড়ির ভেতরের বাতি জ্বালিয়ে দেন, যাতে রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষগুলো তাঁকে দেখতে পান। আলো জ্বলে উঠলে তাঁদের কেউ হাত নাড়েন, কেউ তাকিয়ে থাকেন। গাড়ির ভেতর থেকেও হাত তুলে সাড়া দেন প্রধানমন্ত্রী।

এই যোগাযোগে কোনো আনুষ্ঠানিকতা নেই। গাড়ি থামে না, কুশল বিনিময় হয় না, কথাও হয় না। থাকে শুধু কয়েক মুহূর্তের দেখা ও হাত নেড়ে শুভেচ্ছা বিনিময়। কিন্তু দিনের পর দিন একই দৃশ্যের পুনরাবৃত্তিতে অপেক্ষমাণ মানুষগুলোর সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর এক ধরনের পরিচিতি তৈরি হয়েছে।

আতিকুর রহমান রুমনের ভাষ্য, শুরুতে অপেক্ষাটা ছিল মূলত পথের পাশের মানুষগুলোর। তাঁরা জানতেন, এই পথ দিয়ে প্রধানমন্ত্রী যাবেন। তাই কাজের ফাঁকে কেউ রাস্তার পাশে এসে দাঁড়াতেন, কেউ অপেক্ষা করতেন একঝলক দেখার আশায়।

পরে বিষয়টি যেন একতরফা থাকেনি। পরিচিত জায়গাগুলো কাছাকাছি এলে প্রধানমন্ত্রীও পথের পাশে থাকা পরিচিত মুখগুলো খুঁজে দেখেন। তাঁরা আজও সেখানে আছেন কি না, তা যেন তাঁরও নজরে থাকে।

এই সম্পর্কের কোনো আনুষ্ঠানিক আয়োজন নেই। নেই মঞ্চ, বক্তৃতা কিংবা করতালির আয়োজন। আছে শুধু অপেক্ষা, পরিচিত কিছু মুখ এবং কয়েক মুহূর্তের চোখাচোখি। রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষ আর চলন্ত গাড়ির ভেতরের প্রধানমন্ত্রীর মধ্যে তৈরি হওয়া এই নীরব যোগাযোগই তাঁদের কাছে বিশেষ হয়ে উঠেছে।

কয়েক হাত দূরত্বে থেকেও কথাবিহীন এই যোগাযোগে যে আবেগ তৈরি হয়, তার স্থায়িত্ব হয়তো কয়েক সেকেন্ডের দেখার চেয়েও দীর্ঘ। প্রতিদিনের ব্যস্ততার মধ্যে এই ক্ষণিকের দেখাই তাই কারও কারও কাছে হয়ে উঠেছে অপেক্ষার একটি বিশেষ কারণ।

আরএস-রাসেল

০ মন্তব্য


কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!