বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডে (পিডিবি) উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী (এসডিই) পদে পদোন্নতি, নিয়োগ ও পদোন্নতি তফসিল এবং প্রস্তাবিত পূর্ণাঙ্গ চাকরি প্রবিধানমালা-২০২৬ নিয়ে আপত্তি জানিয়েছে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড ডিপ্লোমা প্রকৌশলী সমিতি (ডিপ্রকৌস)। সংগঠনটির অভিযোগ, অর্থ বিভাগের জিও ছাড়া এসডিই পদে পদোন্নতি এবং প্রস্তাবিত চাকরি প্রবিধানমালায় ডিপ্লোমা প্রকৌশলীদের সঙ্গে বৈষম্য করা হচ্ছে। এতে রাষ্ট্রের বিপুল আর্থিক ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে বলেও দাবি করেছে সংগঠনটি।
বুধবার (২ সেপ্টেম্বর) রাজধানীর বিদ্যুৎ ভবনের সামনে শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ সভা ও মানববন্ধন করে সংগঠনটি। পরে ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে প্রস্তাবিত বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (কর্মচারী) চাকরি প্রবিধানমালা-২০২৬, নিয়োগ ও পদোন্নতি তফসিল-২০২৬ এবং প্রস্তাবিত জনবল কাঠামো নিয়ে সংগঠনের অবস্থান তুলে ধরেন নেতারা।
সংবাদ সম্মেলনে বক্তারা বলেন, ডিপ্রকৌস পূর্ণাঙ্গ চাকরি প্রবিধানমালা প্রণয়নের বিরোধী নয়। বরং শুরু থেকেই বৈষম্যহীন, আইনসম্মত, ন্যায়সংগত ও দীর্ঘমেয়াদি টেকসই একটি চাকরি প্রবিধানমালা প্রণয়নের পক্ষে তারা অবস্থান নিয়ে আসছেন। এ বিষয়ে বিদ্যুৎ বিভাগ, পিডিবি এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে ধারাবাহিকভাবে আবেদন, মতবিনিময় সভা ও লিখিত নীতিগত সুপারিশের মাধ্যমে তাদের বক্তব্য তুলে ধরা হয়েছে।
সংগঠনের দাবি, বিদ্যুৎ বিভাগ ২০২৫ সালের ৩০ নভেম্বর পূর্ণাঙ্গ চাকরি প্রবিধানমালা প্রণয়ন সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত পিডিবির নিয়োগ ও পদোন্নতি কার্যক্রম স্থগিত রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। কিন্তু প্রবিধানমালা প্রণয়নের কাজ সম্পন্ন হওয়ার আগেই ২০২৬ সালের ৩০ এপ্রিল ওই স্থগিতাদেশ প্রত্যাহার করা হয়। তাদের মতে, স্থগিতাদেশ বহাল থাকলে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মধ্যে আরও আলোচনা ও সমন্বয়ের মাধ্যমে একটি বৈষম্যহীন ও গ্রহণযোগ্য প্রবিধানমালা প্রণয়নের সুযোগ তৈরি হতো।
বক্তারা আরও বলেন, সংগঠনের উত্থাপিত গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত, আইনগত ও প্রশাসনিক বিষয়গুলোর সন্তোষজনক নিষ্পত্তি ও পুনর্বিবেচনা ছাড়াই জনবল নিয়োগ ও পদোন্নতি তফসিলসহ প্রস্তাবিত চাকরি প্রবিধানমালা জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। একটি রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের চাকরি প্রবিধানমালা প্রণয়নের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট আইন, সরকারি আদেশ, প্রশাসনিক ধারাবাহিকতা এবং অংশীজনের মতামত যথাযথভাবে প্রতিফলিত হওয়া প্রয়োজন বলে মন্তব্য করেন তারা।
এক-তৃতীয়াংশ পদোন্নতি পুনর্বহালের দাবি
সংবাদ সম্মেলনে সহকারী প্রকৌশলী (এই) ও উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী (এসডিই) পদের মোট সংখ্যার বিপরীতে উপ-সহকারী প্রকৌশলীদের জন্য এক-তৃতীয়াংশ বা ৩৩ দশমিক ৩৩ শতাংশ পদোন্নতির নীতি পুনর্বহালের দাবি জানানো হয়।
সংগঠনটির নেতারা বলেন, ১৯৯৬ সালে শুধু বোর্ড সভার সিদ্ধান্তের মাধ্যমে এসডিই পদকে পৃথক পদোন্নতিযোগ্য ধাপ হিসেবে বিবেচনার যে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল, তা বাতিল করতে হবে। একই সঙ্গে ১৯৮৪ সালের এনাম কমিশনের সুপারিশ অনুযায়ী এই ও এসডিই পদকে পুনরায় সমতুল্য পদ হিসেবে বিবেচনা করে অভিন্ন জ্যেষ্ঠতা তালিকা পুনর্বহাল করতে হবে।
এ ছাড়া ১৯৯৬ সালের আগের ব্যবস্থার মতো এই ও এসডিই পদের মোট সংখ্যার বিপরীতে উপ-সহকারী প্রকৌশলীদের জন্য এক-তৃতীয়াংশ পদোন্নতির ব্যবস্থা পুনর্বহালের দাবি জানানো হয়।
প্রস্তাবিত চাকরি প্রবিধানমালা-২০২৬-এর নিয়োগ ও পদোন্নতি তফসিলে এসডিই পদকে পৃথক পদোন্নতিযোগ্য ধাপ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করার আগে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সম্মতিপত্র এবং অর্থ বিভাগ কর্তৃক পৃষ্ঠাঙ্কিত জিওর কপি উপস্থাপনের দাবিও জানিয়েছে সংগঠনটি। তা না হলে এসডিই পদকে পৃথক পদোন্নতির ধাপ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত না করে ১৯৮২ সালের সার্ভিস রুল এবং ১৯৮৪ সালের এনাম কমিশনের সুপারিশের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে তফসিল সংশোধনের দাবি জানানো হয়।
সার্ভিস রুল ও জনবল কাঠামো পুনর্বিবেচনার দাবি
ডিপ্রকৌসের অন্যান্য দাবির মধ্যে রয়েছে প্রস্তাবিত সার্ভিস রুলস-২০২৬ পুনর্বিবেচনা করে সার্ভিস রুল-১৯৮২-এর ক্লজ-২৪ পুনর্বহাল করা। পাশাপাশি নিয়োগ ও পদোন্নতি তফসিল-২০২৬-এর আইনগত ভিত্তি যাচাই করে প্রয়োজনীয় সংশোধনের দাবি জানিয়েছে সংগঠনটি।
ফিরোজ কমিশনের প্রস্তাবিত জনবল কাঠামো পুনর্বিবেচনা করে প্রয়োজনীয় সব দপ্তরে উপ-সহকারী প্রকৌশলীর পদ সংরক্ষণ এবং প্রকৌশল প্রশাসনে ‘Engineering Pyramid’ পুনঃপ্রতিষ্ঠারও দাবি জানানো হয়েছে।
পূর্ণাঙ্গ চাকরি প্রবিধানমালা চূড়ান্ত করার আগে সংশ্লিষ্ট সব অংশীজন, বিশেষ করে ডিপ্লোমা প্রকৌশলীদের প্রতিনিধিত্বকারী সংগঠনের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক মতবিনিময় ও পরামর্শের ভিত্তিতে নীতিমালা চূড়ান্ত করার দাবি জানিয়েছে ডিপ্রকৌস।
উচ্চপর্যায়ের যৌথ কমিটি গঠনের দাবি
বিষয়টি পর্যালোচনার জন্য জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের নেতৃত্বে একটি উচ্চপর্যায়ের যৌথ পর্যালোচনা কমিটি গঠনের দাবি জানিয়েছে সংগঠনটি। কমিটিতে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়, বিদ্যুৎ বিভাগ, বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড এবং বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড ডিপ্লোমা প্রকৌশলী সমিতির প্রতিনিধিদের অন্তর্ভুক্ত করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
সংগঠনের পক্ষ থেকে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলা হয়, প্রস্তাবিত প্রবিধানমালা চূড়ান্ত অনুমোদনের আগে সংশ্লিষ্ট আইন, সরকারি আদেশ, প্রশাসনিক নজির এবং সংগঠনের উপস্থাপিত নীতিগত বিষয়গুলো পুনর্বিবেচনা করে একটি বৈষম্যহীন, আইনসম্মত ও দীর্ঘমেয়াদি টেকসই পূর্ণাঙ্গ চাকরি প্রবিধানমালা প্রণয়নের উদ্যোগ নিতে হবে।
বক্তারা বলেন, ‘আমরা পূর্ণাঙ্গ চাকরি প্রবিধানমালার বিরোধী নই; আমরা একটি বৈষম্যহীন, আইনসম্মত, ন্যায়সংগত ও টেকসই পূর্ণাঙ্গ চাকরি প্রবিধানমালা চাই।’
তারা বলেন, সংগঠন শান্তিপূর্ণ, গণতান্ত্রিক ও আইনসম্মত কর্মসূচিতে বিশ্বাস করে এবং আলোচনার মাধ্যমে সমস্যার সমাধানই তাদের প্রথম প্রত্যাশা। তবে নীতিগত বিষয়গুলো যথাযথভাবে বিবেচনা করা না হলে কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ ও সদস্যদের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী পর্যায়ক্রমে শান্তিপূর্ণ সাংগঠনিক কর্মসূচি অব্যাহত রাখা হবে। প্রয়োজনে প্রচলিত আইন অনুযায়ী আইনগত প্রতিকার গ্রহণের বিষয়ও বিবেচনা করা হবে।
পরিশেষে পিডিবির প্রকৌশল প্রশাসনের দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থ, পেশাগত ভারসাম্য ও প্রশাসনিক স্থিতিশীলতার কথা বিবেচনা করে বিষয়টি নিরপেক্ষভাবে পুনর্বিবেচনা এবং সংশ্লিষ্ট সব অংশীজনের অংশগ্রহণে একটি গ্রহণযোগ্য সমাধানে পৌঁছানোর জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানায় বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড ডিপ্লোমা প্রকৌশলী সমিতি।
কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!