যুক্তরাষ্ট্র   শনিবার ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, শনিবার ২৭ ভাদ্র ১৪৩৩

মানুষ অপমানের স্মৃতি সহজে ভুলতে পারে না কেন

এখন বাংলা ডেস্ক

প্রকাশিত: ০৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৫:৩৬ AM

৫৪
মানুষ অপমানের স্মৃতি সহজে ভুলতে পারে না কেন

বছরের পর বছর পেরিয়ে গেছে। তবু হঠাৎ কোনো একদিন মনে পড়ে যেতে পারে ২০১৬ সালের কোনো পার্টিতে বলা একটি বিব্রতকর কথা। হয়তো ঘটনাটি অন্যরা অনেক আগেই ভুলে গেছে, কিন্তু আপনার মনে সেটি এখনো স্পষ্ট। এমনটা কেন হয়?

মনোবিজ্ঞান ও মস্তিষ্কের কার্যক্রম নিয়ে গবেষণার তথ্য বলছে, সব স্মৃতি মস্তিষ্ক একইভাবে সংরক্ষণ করে না। কোনো ঘটনা যদি আমাদের আবেগে তীব্র প্রভাব ফেলে—তা লজ্জা, ভয়, আনন্দ কিংবা অস্বস্তি যা-ই হোক—তাহলে মস্তিষ্ক সেটিকে সাধারণ দৈনন্দিন তথ্যের তুলনায় বেশি গুরুত্ব দিয়ে ধরে রাখে।

আবেগ যত তীব্র, স্মৃতিও তত স্থায়ী

বিব্রতকর মুহূর্তে সাধারণত অন্যদের কাছে নিজের ভাবমূর্তি নিয়ে হঠাৎ একধরনের হুমকির অনুভূতি তৈরি হয়। মস্তিষ্ক সেটিকে গুরুত্বপূর্ণ সংকেত হিসেবে ধরে নেয়। এ কারণেই বহু বছর পরও কোনো অপমানজনক বা বিব্রতকর ঘটনার খুঁটিনাটি মনে থাকতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, আবেগের তীব্রতা স্মৃতিকে দীর্ঘস্থায়ী করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। যে ঘটনা আমাদের গভীরভাবে নাড়া দেয়, মস্তিষ্ক সেটিকে ভবিষ্যতের জন্য সংরক্ষণ করে রাখে।

সামাজিক ব্যথাও মনে গভীর ছাপ ফেলে

অন্যের সামনে অপমানিত বা প্রত্যাখ্যাত হওয়ার অনুভূতিও মানুষের মনে তীব্র প্রতিক্রিয়া তৈরি করতে পারে। সামাজিক প্রত্যাখ্যানের সঙ্গে শারীরিক ব্যথার অনুভূতির কিছুটা মিল রয়েছে—এমন তথ্য বিভিন্ন গবেষণায় উঠে এসেছে।

মানুষ স্বভাবতই একটি গোষ্ঠীর অংশ হয়ে থাকতে চায়। তাই অন্যদের সামনে নিজের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে মনে হলে মস্তিষ্ক সেটিকে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হিসেবে বিবেচনা করতে পারে। ভবিষ্যতে যেন একই পরিস্থিতির পুনরাবৃত্তি না ঘটে, সে জন্য ঘটনাটি মনে রাখার প্রবণতা তৈরি হয়।

অমীমাংসিত আবেগ বারবার ফিরে আসে

কোনো বিব্রতকর ঘটনা নিয়ে কথা বলা না হলে বা সেটিকে নিজের কাছে গ্রহণযোগ্যভাবে ব্যাখ্যা করা না গেলে স্মৃতিটি আরও বেশি ফিরে আসতে পারে। কারণ, মস্তিষ্ক তখনো যেন ঘটনাটির অর্থ খুঁজে চলেছে।

কখনো কাছের কারও সঙ্গে সেই ঘটনা নিয়ে কথা বলা, বিষয়টি নিয়ে হাসতে পারা কিংবা সময়ের সঙ্গে ঘটনাটিকে নতুন দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা অস্বস্তি কমাতে সাহায্য করতে পারে। অর্থাৎ, স্মৃতিটিকে মনের মধ্যে নতুনভাবে প্রক্রিয়াজাত করার সুযোগ তৈরি হয়।

মস্তিষ্ক আপনাকে সতর্কও করছে

পুরোনো বিব্রতকর ঘটনা মনে পড়ার পেছনে শুধু কষ্ট দেওয়ার বিষয়টি নেই। এর একটি কারণ হতে পারে শেখার প্রক্রিয়া। মস্তিষ্ক যেন মনে করিয়ে দিতে চায়—আগে এমন পরিস্থিতিতে কী ঘটেছিল, যাতে ভবিষ্যতে একই ধরনের পরিস্থিতি এড়িয়ে চলা যায়।

সমস্যা হলো, এই সতর্কতা প্রয়োজনের তুলনায় অনেক বেশি সময় ধরে চলতে পারে। মস্তিষ্ক সব সময় বুঝতে পারে না কখন সেই শিক্ষা বা সতর্কতার প্রয়োজন শেষ হয়েছে।

অন্যরা কি সত্যিই এতটা মনে রাখে?

আরেকটি বিষয় এখানে গুরুত্বপূর্ণ। মানুষ প্রায়ই মনে করে, তার করা বিব্রতকর কাজটি আশপাশের সবাই খুব ভালোভাবে লক্ষ্য করেছে এবং মনে রেখেছে। মনোবিজ্ঞানে এটিকে বলা হয় ‘স্পটলাইট এফেক্ট’।

বাস্তবে অন্য মানুষ হয়তো ঘটনাটির দিকে আপনার ধারণার তুলনায় অনেক কম মনোযোগ দিয়েছিল। আপনার কাছে ঘটনাটি গুরুত্বপূর্ণ হওয়ার কারণ হলো, আপনি নিজেই সেটির কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন। অন্যদের কাছে সেটি হয়তো সামান্য একটি ঘটনা, যা তাঁরা পরে আর মনেই রাখেননি।

‘জার্নাল অব পার্সোনালিটি অ্যান্ড সোশ্যাল সাইকোলজি’তে প্রকাশিত গবেষণাতেও মানুষের নিজের প্রতি অন্যদের মনোযোগকে অতিরিক্ত মনে করার এই প্রবণতার বিষয়টি উঠে এসেছে।

তাই হঠাৎ কোনো পুরোনো অপমান বা বিব্রতকর মুহূর্ত মনে পড়ে গেলে সেটিকে অস্বাভাবিক কিছু ভাবার প্রয়োজন নেই। এটি মানুষের মস্তিষ্কের স্বাভাবিক একটি প্রক্রিয়া। মস্তিষ্ক তীব্র আবেগের ঘটনাগুলো ধরে রাখে, সেগুলো থেকে শিক্ষা নেওয়ার চেষ্টা করে এবং ভবিষ্যতে একই অভিজ্ঞতা থেকে আপনাকে রক্ষা করতে চায়। তবে মনে রাখা দরকার, আপনি যে ঘটনাটিকে আজও বড় করে দেখছেন, অন্যরা হয়তো সেটি অনেক আগেই ভুলে গেছে।

আরএস-রাসেল

০ মন্তব্য


কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!