যুক্তরাষ্ট্র   বৃহস্পতিবার ১৩ আগস্ট ২০২৬, বৃহস্পতিবার ২৮ শ্রাবণ ১৪৩৩

বস্তির শিশুদের ৫৮.২ শতাংশের নেই জন্মসনদ

এখন বাংলা ডেস্ক

প্রকাশিত: ১৩ আগস্ট ২০২৬, ০৬:০১ AM

বস্তির শিশুদের ৫৮.২ শতাংশের নেই জন্মসনদ

জন্মসনদ নেই—এ কারণে স্কুলে ভর্তি, স্বাস্থ্যসেবা, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির সুবিধা পাওয়া থেকে শুরু করে ভবিষ্যতে রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন সেবা গ্রহণেও বাধার মুখে পড়ছে বস্তি ও পথশিশুরা।

২০২৫ সালে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা কারিতাসের এক জরিপে দেখা গেছে, পথে বেড়ে ওঠা শিশুদের ৫৮ দশমিক ২ শতাংশের জন্মসনদ নেই। একই জরিপে বস্তি এলাকার ৯১ দশমিক ৭ শতাংশ পরিবার সরকারি সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির বাইরে থাকার তথ্য উঠে এসেছে।

ঢাকা, ময়মনসিংহ ও রাজশাহী শহরের ৬৬৭ পথশিশু এবং বস্তিতে বসবাসরত ১ হাজার ২৪৬টি পরিবারের ওপর জরিপটি চালানো হয়। এতে অংশ নেওয়া পথশিশুদের ৫১ দশমিক ৬ শতাংশ বর্তমানে শিক্ষার বাইরে রয়েছে।

জন্মসনদহীন শৈশব

রাজধানীর মিরপুরের ঝিলপাড় বস্তিতে বসবাস বিলকিস বানুর। বয়স মাত্র ১৮ বছর। তিন বছরের একটি মেয়েশিশুর মা তিনি। মাত্র ১৫ বছর বয়সে তাঁর বিয়ে হয়েছিল।

একই বস্তির ১৬ বছর বয়সী আছিয়া জানায়, তাদের বাড়ি রংপুরে। সেখানে দরিদ্র পরিবারের মেয়েদের অল্প বয়সে বিয়ে দেওয়ার প্রবণতা রয়েছে। জন্মসনদ না থাকায় বয়সের আনুষ্ঠানিক যাচাইয়ের বিষয়টিও অনেক ক্ষেত্রে সামনে আসে না।

মিরপুরের ৬ নম্বর ওয়ার্ড কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, প্রায় ২৫ একর জমির ওপর গড়ে ওঠা চারটি বস্তিতে ৫০ হাজারের বেশি মানুষের বসবাস। এর মধ্যে ৮ থেকে ১০ বছর বয়সী শিশুর সংখ্যা ৮ হাজারের বেশি। তাদের বড় একটি অংশের জন্মনিবন্ধন নেই।

জন্মনিবন্ধন করতে গিয়ে দালালের খপ্পরে পড়ার অভিযোগও রয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, জন্মনিবন্ধনের জন্য দালালেরা প্রায় ১ হাজার ৫০০ টাকা দাবি করেন। দরিদ্র পরিবারের জন্য এই অর্থ জোগাড় করাও কঠিন।

কাগজপত্রের জটিলতায় স্কুলের বাইরে

রাজধানীর ঝিলপাড়, চলন্তিকা ও আরামবাগ বস্তি এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, জন্মনিবন্ধন না থাকা এবং প্রয়োজনীয় কাগজপত্রের জটিলতায় অনেক শিশু স্কুলে ভর্তি হতে পারছে না।

স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য, দীর্ঘদিন স্কুলের বাইরে থাকা শিশুদের কেউ কেউ মোবাইল ফোনে আসক্ত হয়ে পড়ছে। আবার কেউ জড়িয়ে পড়ছে বাল্যবিবাহ, শিশুশ্রমসহ বিভিন্ন ঝুঁকিপূর্ণ কর্মকাণ্ডে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জন্ম ও মৃত্যুনিবন্ধন এবং জাতীয় পরিচয়পত্রসংক্রান্ত প্রক্রিয়া সহজ করার পাশাপাশি বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থাগুলোকে কার্যকরভাবে সম্পৃক্ত না করলে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর বড় একটি অংশ মৌলিক এসব সেবার বাইরে থেকে যাবে।

ঢাকা সিটি করপোরেশনের ৬ নম্বর ওয়ার্ডের সচিব মো. আব্দুল সামাদ বলেন, ‘যাদের বাবা নেই, মা নেই, পথশিশু, তাদেরও জন্মনিবন্ধন আমরা করছি।’

নিবন্ধনে অগ্রগতি, তবু বড় ঘাটতি

জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধনের রেজিস্ট্রার জেনারেলের কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, দেশে প্রতিদিন গড়ে ৪০ থেকে ৫০ হাজার জন্মনিবন্ধন সম্পন্ন হচ্ছে। পাশাপাশি সংশোধনের আবেদনও নিষ্পত্তি করা হচ্ছে।

তবে ভাসমান ও স্থায়ী ঠিকানাবিহীন পরিবারের শিশুদের জন্মনিবন্ধন এখনো বড় চ্যালেঞ্জ। নিয়ম অনুযায়ী জন্মস্থান বা বর্তমান ঠিকানা থাকলে জন্মনিবন্ধনের সুযোগ পাওয়ার কথা। কিন্তু বাস্তবে নানা জটিলতার কারণে অনেক শিশু এখনো এই সেবার বাইরে রয়েছে।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) ও ইউনিসেফের যৌথ জরিপের সর্বশেষ তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের জাতীয়ভাবে জন্মনিবন্ধনের হার ৫৯ শতাংশ। ২০১৯ সালে এ হার ছিল ৫৬ শতাংশ। অর্থাৎ কয়েক বছরে কিছুটা অগ্রগতি হলেও সর্বজনীন জন্মনিবন্ধনের লক্ষ্যের তুলনায় হার এখনো অনেক কম।

টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অর্জনে ২০৩০ সালের মধ্যে শতভাগ জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন নিশ্চিত করার অঙ্গীকার রয়েছে সরকারের।

ঠিকানা থাকলেই করা যাবে নিবন্ধন

স্থানীয় সরকার বিভাগের জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধনের রেজিস্ট্রার জেনারেল (অতিরিক্ত সচিব) মো. যাহিদ হোসেন বলেন, ঢাকায় স্থায়ী বাসিন্দার তুলনায় অস্থায়ী ও ভাসমান মানুষের সংখ্যা বেশি হওয়ায় এখানে জন্মনিবন্ধনের হার তুলনামূলক কম।

ভাসমান ও প্রান্তিক পরিবারের শিশুদের নিবন্ধন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, জন্মনিবন্ধনের জন্য বিধিবদ্ধ কিছু নিয়ম রয়েছে এবং সেগুলো অনুসরণ করেই নিবন্ধন করা হচ্ছে। ভাসমান জনগোষ্ঠীর ক্ষেত্রে জন্মস্থান বা বর্তমান ঠিকানা থাকলেই জন্মনিবন্ধনের সুযোগ রয়েছে।

শহরের ভাসমান জনগোষ্ঠীর জন্মনিবন্ধন নিশ্চিত করতে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান ও বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী উন্নয়ন সংস্থাকে সঙ্গে নিয়ে কাজ করা হচ্ছে বলেও জানান তিনি। এ কাজে সংশ্লিষ্ট কর্মীদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থাও করা হয়েছে।

ঢাকা উত্তর ও ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এ নিবন্ধনের মূল দায়িত্ব পালন করছে।

যাহিদ হোসেন বলেন, আনুষ্ঠানিকভাবে স্কুলে যাওয়া সব শিশুর জন্মনিবন্ধন রয়েছে। কারণ জন্মনিবন্ধন ছাড়া তাদের শিক্ষাজীবন শুরু করা সম্ভব নয়।

জন্মসনদ না থাকা শুধু প্রশাসনিক সমস্যা নয়

কারিতাস ডেভেলপমেন্ট ইনস্টিটিউটের পরিচালক থিওফিল নকরেক বলেন, জন্মসনদবিহীন শিশুদের ৭১ দশমিক ৪ শতাংশ তাদের বাবা-মায়ের জাতীয় পরিচয়পত্র নম্বর জানে না। ফলে বিদ্যমান নিয়ম অনুযায়ী তাদের জন্মনিবন্ধন করানো প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়।

তিনি বলেন, ‘জন্মসনদ না থাকা শুধু প্রশাসনিক সমস্যা নয়; এটি একটি মানবাধিকার সংকট।’

জন্মসনদ না থাকলে শিশুরা বিদ্যালয়ে ভর্তি, স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণ, সরকারি ভাতা পাওয়া এবং ভবিষ্যতে নাগরিক হিসেবে বিভিন্ন অধিকার ও সেবা পাওয়ার ক্ষেত্রে বাধার মুখে পড়ে।

দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য সরকারের বিভিন্ন সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির কথা উল্লেখ করে থিওফিল নকরেক বলেন, ‘ফ্যামিলি কার্ড’ উদ্যোগ প্রশংসনীয় ও সময়োপযোগী। তবে পরিবারহীন বা পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে রেলস্টেশন, লঞ্চঘাট, ফুটপাত, বাজার ও বস্তিতে বেড়ে ওঠা শিশুরা এখনো অনেকাংশে রাষ্ট্রীয় সুরক্ষার বাইরে।

স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা ও জন্মনিবন্ধন দপ্তরের মধ্যে কার্যকর সমন্বয়ের অভাবে জন্মের পরপরই শিশুর নিবন্ধন নিশ্চিত করা যাচ্ছে না বলেও তিনি মন্তব্য করেন।

বর্তমানে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ সরাসরি জন্ম ও মৃত্যুনিবন্ধন করতে পারে না। জন্মের পর পরিবারকে আলাদা দপ্তরে গিয়ে নিবন্ধনের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হয়।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের অনেক দেশে হাসপাতালে সংঘটিত জন্ম ও মৃত্যুর নিবন্ধনের দায়িত্ব হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের ওপর থাকায় সেখানে প্রায় শতভাগ নিবন্ধন নিশ্চিত করা সম্ভব হয়েছে।

বাড়ি বাড়ি ক্যাম্পেইনের সুপারিশ

পরিস্থিতি উত্তরণে কারিতাস বাংলাদেশের পরিচালক (কর্মসূচি) দাউদ জীবন দাশ কয়েকটি সুপারিশ করেছেন। এর মধ্যে রয়েছে পিতামাতাহীন শিশুদের জন্মনিবন্ধন প্রক্রিয়া সহজ করা এবং প্রয়োজনে বাড়ি বাড়ি গিয়ে ওয়ার্ডভিত্তিক ক্যাম্পেইনের মাধ্যমে শতভাগ জন্মনিবন্ধন নিশ্চিত করা।

এ ছাড়া শিশুর জন্মের পরপরই হাসপাতাল ও কমিউনিটি ক্লিনিকে জন্মনিবন্ধনের ব্যবস্থা চালু, পথশিশুদের রাস্তা থেকে ফিরিয়ে আনতে বিশেষ কর্মসূচি গ্রহণ এবং পরিবারের জীবনমান উন্নয়নে শর্তযুক্ত ভাতা চালুর সুপারিশ করা হয়েছে।

শিশুশ্রম বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া, শিশুশ্রম বা অন্য কোনো কারণে ঝরে পড়া শিশুদের শনাক্ত করে বিদ্যালয়ে ফিরিয়ে আনা এবং পথশিশুদের জন্য শিক্ষাবান্ধব পরিবেশ তৈরির কথাও বলা হয়েছে।

দারিদ্র্যপীড়িত জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়নে সামাজিক নিরাপত্তা ভাতার পরিমাণ বাস্তবসম্মতভাবে বাড়ানো এবং আবেদনপ্রক্রিয়া সহজ করারও দাবি জানানো হয়েছে।

দাউদ জীবন দাশ বলেন, সরকারের নিরাপত্তাবেষ্টনীর আওতায় থাকা পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর অনেকে যে ভাতা পাচ্ছেন, তা অত্যন্ত নগণ্য। মাসিক ৫০০ থেকে ৬৫০ টাকা বাস্তবসম্মত ও সময়োপযোগী সহায়তা হতে পারে না।

পথ ও সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের জন্য সরকারি কর্মসূচিও অপ্রতুল উল্লেখ করে তিনি বলেন, পথশিশু ও সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের ভালো-মন্দ দেখার দায়িত্ব পরিবার ও রাষ্ট্র উভয়ের।

তিনি বলেন, ‘আমরা যদি এসব শিশুর ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হই, তাহলে রাষ্ট্র হিসেবে আমরা অনেকাংশেই পিছিয়ে যাব। তাই তাদের নিরাপদ ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে অবিলম্বে সরকারসহ আমাদের সবার নজর দিতে হবে।’

ঢাকায় কেন কম জন্মনিবন্ধন

ঢাকা বিভাগে জন্মনিবন্ধনের হার তুলনামূলক কম হওয়ার কারণ সম্পর্কে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের অঞ্চল-১০-এর নির্বাহী কর্মকর্তা আক্তার উন্নেছা শিউলী বলেন, ঢাকায় বসবাসকারী অধিকাংশ মানুষই অস্থায়ী ও ভাড়াটিয়া। তাঁদের বড় একটি অংশ দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে এসে বসবাস করছে।

তিনি বলেন, জন্মনিবন্ধনের একটি নিয়ম হলো স্থায়ী ঠিকানায় নিবন্ধন করা। গ্রামের বা জেলা-থানা পর্যায়ের মানুষের অধিকাংশ স্থানীয় হওয়ায় সেখানে জন্মনিবন্ধনের হার তুলনামূলক বেশি।

জন্মনিবন্ধনসহ বিভিন্ন সেবা নিতে অফিসে আসা মানুষের মধ্যে নারীদের উপস্থিতি তুলনামূলক কম বলেও জানান তিনি। তবে নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সবাইকে সেবা নিতে অফিসে স্বাগত জানানো হয়।

একটি জন্মসনদ, একটি ভবিষ্যৎ

বস্তির সরু গলি কিংবা ফুটপাতের পাশে বেড়ে ওঠা একটি শিশুর কাছে জন্মসনদ হয়তো একটি ছোট কাগজের টুকরো। কিন্তু সেই কাগজই তার জন্য খুলে দিতে পারে স্কুলের দরজা, স্বাস্থ্যসেবার সুযোগ, সামাজিক নিরাপত্তার অধিকার এবং ভবিষ্যতে একজন পূর্ণাঙ্গ নাগরিক হিসেবে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির পথ।

কারিতাসের জরিপ বলছে, হাজারো শিশুর হাতে এখনো সেই কাগজ নেই। কারও বাবা-মায়ের জাতীয় পরিচয়পত্র নেই, কারও স্থায়ী ঠিকানা নেই, আবার কারও পরিবারই নেই। দারিদ্র্য ও কাগজপত্রের জটিলতায় অনেক শিশু জন্মের পর থেকেই রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার প্রান্তে পড়ে আছে।

জন্মনিবন্ধনের হার বাড়ানোর অর্থ শুধু একটি পরিসংখ্যান বাড়ানো নয়। এর অর্থ হলো—রাষ্ট্রের হিসাবের খাতায় প্রতিটি শিশুর অস্তিত্ব নিশ্চিত করা, তার অধিকার স্বীকার করা এবং ভবিষ্যতের জন্য তাকে একটি পরিচয় দেওয়া।

আরএস-রাসেল

০ মন্তব্য


কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!