কালিয়াকৈর হাই-টেক পার্কে বিনিয়োগ ও কার্যক্রমে নতুন গতি এসেছে বলে জানিয়েছেন ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম। তিনি বলেছেন, পার্কটিতে বিনিয়োগের আগ্রহ দেখিয়েছে দেশি-বিদেশি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক একটি কোম্পানির প্রস্তাবিত এআই ডেটা সেন্টার প্রকল্পে গুগল, মেটা ও টিকটকসহ বিশ্বের বিভিন্ন প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে বিনিয়োগের প্রস্তাব এসেছে।
শনিবার গাজীপুরের কালিয়াকৈর হাই-টেক পার্ক পরিদর্শনে গিয়ে সাংবাদিকদের এসব কথা বলেন মন্ত্রী। দেশের প্রথম এই হাই-টেক পার্কে প্রযুক্তিনির্ভর শিল্পের বিকাশ, দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান ও বিদ্যমান চ্যালেঞ্জ সরেজমিনে দেখতে তিনি সেখানে যান।
সরকারের ঘোষিত ১৮০ দিনের কর্মপরিকল্পনার অংশ হিসেবেও এ পরিদর্শন করা হয়। সরকারের নির্বাচনী ইশতেহারে সফটওয়্যার, অ্যাপ ও হার্ডওয়্যার শিল্পে বাংলাদেশকে আন্তর্জাতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে নেওয়া এবং ‘মেইড ইন বাংলাদেশ’ উদ্যোগের মাধ্যমে দেশীয় প্রযুক্তিপণ্যকে বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতামূলক করার কথা বলা হয়েছে।
বিনিয়োগ বাড়াতে প্রণোদনার উদ্যোগ
মন্ত্রী বলেন, নির্বাচনী ইশতেহারের আলোকে ‘ন্যাশনাল গ্রিন ইন্ডাস্ট্রিয়াল পলিসি’ বাস্তবায়ন এবং এআই হাব, সফটওয়্যার, অ্যাপ ও হার্ডওয়্যার উৎপাদনে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অংশ হিসেবে কালিয়াকৈর হাই-টেক পার্কে বিনিয়োগ ত্বরান্বিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করতে ফিসকাল ও নন-ফিসকাল প্রণোদনার প্রস্তাবও প্রস্তুত করা হচ্ছে বলে জানান তিনি।
মাহবুব আনাম বলেন, ২০০৪ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারি কালিয়াকৈরে ২৩১ দশমিক ৬৫ একর জমিতে হাই-টেক পার্ক প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্ত হয়। ২০১৬ সালে এর সঙ্গে আরও ৯৭ দশমিক ৩৩ একর জমি যুক্ত করা হয়। বর্তমানে পার্কটির মোট আয়তন প্রায় ৩৭১ একর।
৮৫ প্রতিষ্ঠানকে জমি ও স্পেস বরাদ্দ
মন্ত্রী জানান, মৌলিক অবকাঠামো উন্নয়নের পর দেশি-বিদেশি কোম্পানিকে জমি ও প্রস্তুত স্পেস বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এখন পর্যন্ত কালিয়াকৈর হাই-টেক পার্কে ৮৫টি প্রতিষ্ঠানকে জমি বা স্পেস বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে বিদেশি প্রতিষ্ঠান ৭টি।
বরাদ্দ পাওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে ৪০টি ইতিমধ্যে ব্যবসা বা উৎপাদন কার্যক্রম শুরু করেছে। ২৮টি প্রতিষ্ঠানের নির্মাণকাজ চলছে এবং ১৭টি প্রতিষ্ঠান শিগগিরই নির্মাণকাজ শুরু করবে।
পার্কটিতে মোট বিনিয়োগ প্রস্তাবের পরিমাণ প্রায় ১৬৩ কোটি ৬০ লাখ মার্কিন ডলার। এর মধ্যে এখন পর্যন্ত প্রায় ২৮ কোটি ৩০ লাখ মার্কিন ডলার বা প্রায় ৩ হাজার ২৪৫ কোটি টাকা বিনিয়োগ হয়েছে। এ ছাড়া পার্কের মৌলিক অবকাঠামো উন্নয়নে সরকার ৫০০ কোটি টাকার বেশি ব্যয় করেছে।
ব্যবসায়িক পরিবেশ ও ইকোসিস্টেম যথাযথভাবে গড়ে তোলা গেলে পার্কটি থেকে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রায় এক লাখ মানুষের কর্মসংস্থান হতে পারে বলে জানান মন্ত্রী।
চীন, জাপান, ভারত, কোরিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রহ
বিদেশি বিনিয়োগের বিষয়ে মাহবুব আনাম বলেন, চীন, জাপান, ভারত, দক্ষিণ কোরিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সাতটি প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে মোট প্রায় ৬২ কোটি ৯০ লাখ মার্কিন ডলারের বিনিয়োগ প্রস্তাব এসেছে।
তাঁর মতে, এতে কালিয়াকৈর হাই-টেক পার্ক শুধু দেশীয় প্রযুক্তিপণ্য উৎপাদনের কেন্দ্র নয়, ভবিষ্যতে বিদেশি প্রযুক্তি কোম্পানির উৎপাদন, সংযোজন, গবেষণা ও উন্নয়ন এবং রপ্তানির গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হয়ে ওঠার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
বর্তমানে পার্কে মোবাইল ফোন, ল্যাপটপ, এটিএম ও ক্যাশ রিসাইকেলার মেশিন, ফাইবার অপটিক্যাল কেবল এবং গাড়ি উৎপাদনকারী বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান কার্যক্রম পরিচালনা করছে। এর মধ্যে হুন্দাইসহ তিনটি গাড়ি উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান রয়েছে।
এ ছাড়া আইওটি ডিভাইস, রাউটার, সুইচ, সিসিটিভি, এসি, রেফ্রিজারেটর, বিভিন্ন হোম অ্যাপ্লায়েন্স, কিডনি ডায়ালাইসিস মেশিন, কিয়স্ক ও এটিএম মেশিনসহ নানা ধরনের প্রযুক্তিপণ্য উৎপাদিত হচ্ছে।
পার্কে দুটি কোম্পানি ডেটা সেন্টার স্থাপনের কাজ করছে। এর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক একটি কোম্পানির প্রস্তাবিত এআই ডেটা সেন্টার প্রকল্প নির্মাণাধীন রয়েছে। এই প্রকল্পে গুগল, মেটা (ফেসবুক) ও টিকটকসহ বিশ্বের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান বিনিয়োগের প্রস্তাব দিয়েছে বলে জানান মন্ত্রী।
শুল্ক-কর সুবিধার প্রস্তাব
হাই-টেক পার্কে বিনিয়োগ বাড়াতে মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানিতে শুল্ক-কর সুবিধা, বিদ্যুৎ ও গ্যাসসহ প্রয়োজনীয় সেবায় ভ্যাট সুবিধা এবং হাই-টেক পণ্যের তালিকা সম্প্রসারণের প্রস্তাব করা হচ্ছে বলে জানান মাহবুব আনাম।
ম্যানুফ্যাকচারিংয়ের পাশাপাশি অ্যাসেম্বলিং প্রতিষ্ঠানগুলোকে একই সুবিধার আওতায় আনার বিষয়েও প্রস্তাব তৈরি করা হচ্ছে।
এ ছাড়া স্থানীয় বাজারে পণ্য বিপণনের ক্ষেত্রে কাঁচামালে শুল্ক-কর রেয়াত, স্থিতিশীল আয়কর সুবিধা এবং ইভি ব্যাটারি, সোলার ব্যাটারি, ইউপিএস ব্যাটারি ও ই-বাইকের মতো নতুন প্রযুক্তি খাতের জন্য পৃথক প্রণোদনা কাঠামো তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
মন্ত্রী বলেন, অবকাঠামোগত সক্ষমতার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি ও পূর্বানুমেয় নীতিগত সুবিধা নিশ্চিত করা গেলে কালিয়াকৈর হাই-টেক পার্কে বিনিয়োগ আরও বাড়বে। এতে প্রযুক্তিপণ্যের স্থানীয় উৎপাদন বৃদ্ধি, আমদানিনির্ভরতা কমানো, রপ্তানি সম্প্রসারণ এবং উচ্চ দক্ষতার কর্মসংস্থান সৃষ্টির সুযোগ তৈরি হবে।
পরিদর্শনের সময় কালিয়াকৈর হাই-টেক পার্ক কর্তৃপক্ষের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (অতিরিক্ত সচিব) মো. ফজলুর রহমানসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, সংশ্লিষ্ট সরকারি দপ্তর, স্থানীয় প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
এর আগে কালিয়াকৈরে অবস্থিত ইউনিভার্সিটি অব ফ্রন্টিয়ার টেকনোলজি, বাংলাদেশ (ইউএফটিবি)-এ আয়োজিত একটি অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে যোগ দেন তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রী।
আরএস-রাসেল
কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!