যুক্তরাষ্ট্র   রবিবার ২৮ জুন ২০২৬, রবিবার ১৩ আষাঢ় ১৪৩৩

নতুন মিউচুয়াল ফান্ড বিধিমালা বাস্তবায়নে ব্যবস্থাপকদের বিরুদ্ধে অপপ্রচার :অভিযোগ বিনিয়োগকারীদের

এখন বাংলা ডেস্ক

প্রকাশিত: ২০ জুন ২০২৬, ০৩:৪৩ PM

২৯
নতুন মিউচুয়াল ফান্ড বিধিমালা বাস্তবায়নে ব্যবস্থাপকদের বিরুদ্ধে অপপ্রচার :অভিযোগ বিনিয়োগকারীদের

বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) চেয়ারম্যানের আপত্তি এবং শীর্ষ পর্যায়ের আলোচনার পরেও 'মিউচুয়াল ফান্ড বিধিমালা-২০২৫' বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া সচল থাকায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন পুঁজিবাজার সংশ্লিষ্ট বিনিয়োগকারীরা। তারা আশঙ্কা করছেন, এই প্রস্তাবিত বিধিমালা কার্যকর হলে দেশের ক্লোজড-এন্ড (মেয়াদি) মিউচুয়াল ফান্ড খাত সম্পূর্ণ ধ্বংস হতে পারে এবং সামগ্রিক শেয়ারবাজারে এর মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে বাজার রক্ষায় তারা সরাসরি অর্থমন্ত্রীর জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।

শনিবার (২০ জুন) রাজধানীর বিজয়নগরে ক্যাপিটাল মার্কেট জার্নালিস্ট ফোরাম (সিএমজেএফ) কার্যালয়ে আয়োজিত এক সেমিনারে এসব দাবি ও আশঙ্কা তুলে ধরা হয়। 'বাংলাদেশ মিউচুয়াল ফান্ড বিনিয়োগকারী ঐক্য ফ্রন্ট' এই সেমিনারের আয়োজন করে, যেখানে বিভিন্ন বিনিয়োগকারী সংগঠনের প্রতিনিধি এবং সাধারণ বিনিয়োগকারীরা অংশ নেন।


সেমিনারে বক্তারা অভিযোগ করেন, একটি স্বার্থান্বেষী মহল বিএসইসির কিছু অসাধু কর্মকর্তার ইন্ধনে এই বিধিমালার মাধ্যমে বাজারের প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগ সক্ষমতা ধ্বংস করার পায়তারা করছে।

মিউচ্যুয়াল ফান্ড বিনিয়োগকারী ঐক্য ফ্রন্টের সাংগঠনিক সম্পাদক গনেশ রায় বলেন, সম্পদ ব্যবস্থাপকদের বিরুদ্ধে বিনিয়োগকারীদের লভ্যাংশ না দেওয়ার যে তথ্য ছড়ানো হচ্ছে, তা সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, শুধুমাত্র 'রেইস অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট'-ই এ পর্যন্ত ২,০০০ কোটি টাকার বেশি লভ্যাংশ দিয়েছে, যার ডিভিডেন্ড ইল্ড বাজারের অনেক বড় তালিকাভুক্ত কোম্পানির চেয়েও বেশি। একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠী বাজারকে অস্থিতিশীল করতেই এই অপপ্রচার চালাচ্ছে।

ক্যাপিটাল মার্কেট ইনভেস্টর ফোরামের সাধারণ সম্পাদক মেহেদী ফারহান জানান, মেয়াদি মিউচুয়াল ফান্ডের শতভাগ সম্পদ হেফাজতকারীর (কাস্টডিয়ান) কাছে সম্পূর্ণ সুরক্ষিত রয়েছে এবং কাস্টডিয়ানরা নিজেরাও বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। অথচ ফান্ডের সম্পদ লোপাটের ভুয়া তথ্য ছড়ানো হচ্ছে। তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, বিগত বছরগুলোতে এবি ব্যাংক, ন্যাশনাল ব্যাংক, আইসিবি ইসলামিক ব্যাংক ও প্রিমিয়ার ব্যাংকসহ বিভিন্ন ব্যাংক থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা লোপাট হলেও সেগুলো বহাল তবিয়তে চলছে। অথচ মিউচুয়াল ফান্ডের সম্পদ নিরাপদ থাকা সত্ত্বেও বিএসইসি তদন্ত ও পরিদর্শনের নামে হয়রানি করছে, যার ফলে স্বাভাবিক ফান্ড পরিচালনা বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

মিউচ্যুয়াল ফান্ড বিনিয়োগকারী ঐক্য ফ্রন্টের সভাপতি ম. জহুরুল হক সতর্ক করে বলেন, এই বিধিমালা বাস্তবায়িত হলে শেয়ারবাজার থেকে স্থায়ীভাবে ৩০,০০০ থেকে ৪০,০০০ কোটি টাকার সম্পদ হারিয়ে যাবে। মিউচুয়াল ফান্ডগুলোর ৯০ শতাংশ বিনিয়োগ রয়েছে গ্রামীণফোন, ব্যাটবিসি, ব্র্যাক ব্যাংক ও রেনেটার মতো শীর্ষস্থানীয় ‘এ’ ক্যাটাগরির কোম্পানিতে। ফান্ডগুলোর একসাথে রূপান্তর (কনভার্সন) বা অবসায়ন (রিডেম্পশন) হলে বাজারে বিশাল বিক্রির চাপ তৈরি হবে।

এর ফলে ‘এ’ ক্যাটাগরির সকল কোম্পানির শেয়ারের দাম ৫০ শতাংশ পর্যন্ত কমতে পারে এবং সাধারণ বিনিয়োগকারীরা তাদের বিনিয়োগের ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ পর্যন্ত হারানোর ঝুঁকিতে পড়বেন। এই দরপতন বাজারে একটি চেইন রিঅ্যাকশন তৈরি করবে। মার্জিনে শেয়ার কেনা বিনিয়োগকারীদের শেয়ার ব্রোকারেজ হাউসগুলো ফোর্স সেল (বাধ্যতামূলক বিক্রি) করতে বাধ্য হবে, যার ফলে সাধারণ মানুষ পথে বসবে। এর প্রভাব শুধু অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানির ওপর নয়, বরং ব্রোকারেজ হাউস, ট্রাস্টি ও কাস্টডিয়ানসহ পুরো ক্যাপিটাল মার্কেটের ওপর পড়বে।

বাংলাদেশ ক্যাপিটাল মার্কেট ইনভেস্টর অ্যাসোসিয়েশনের আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক মোঃ মেহেদী বিন সাইদ বলেন, মিউচুয়াল ফান্ডগুলোর জোরপূর্বক অবসায়ন হলে এই খাতের সব মানুষ চাকরি হারাবেন। এছাড়া বাজারে এমন ধস নামলে কোনো বিদেশি বিনিয়োগকারী বাংলাদেশে আসবে না। কারণ তারা ক্রমবর্ধমান এবং ইটিএফ বা ডেরিভেটিভসের মতো নতুন প্রোডাক্ট সমৃদ্ধ বাজারে বিনিয়োগ করতে চায়, বাজার থেকে প্রোডাক্ট সরালে নয়।

তিনি আরও জানান, মিউচুয়াল ফান্ডের বিপুল পরিমাণ অর্থ বিভিন্ন ব্যাংকে এফডিআর, বন্ড ও আর্থিক উপকরণ হিসেবে জমা রয়েছে। বর্তমানে নড়বড়ে অবস্থায় থাকা ব্যাংকিং খাত থেকে হঠাৎ এই ফান্ডগুলো তুলে নিতে গেলে ব্যাংকগুলোর ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হবে এবং তারা সময়মতো অর্থ ফেরত দিতে পারবে না। ফলে সাধারণ আমানতকারীরাও টাকা তুলতে সমস্যায় পড়বেন। শক্তিশালী ব্যাংকগুলোও তারল্য সংকটে পড়বে এবং শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষকে এর মাশুল দিতে হবে।

তিনি আরও যোগ করেন, সদ্য প্রকাশিত গেজেটে বিনিয়োগকারীদের অর্থ ফেরতের কোনো সুনির্দিষ্ট সময়সীমা নেই। ফলে বিনিয়োগকারীরা প্রত্যাশার চেয়ে কম অর্থ পাওয়ার আশঙ্কায় আছেন। তিনি এই বিধিমালা সংশোধন বা বাতিলের দাবি জানান।

বাংলাদেশ ক্যাপিটাল মার্কেট ইনভেস্টর অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি এস এম ইকবাল হোসেন বলেন, বিদ্যমান মেয়াদি ফান্ডগুলো বন্ধ বা রূপান্তর করা হলে ফান্ডের সম্পদ বিক্রি করে বিনিয়োগকারীদের অর্থ দিতে হবে। এতে তাৎক্ষণিকভাবে বাজারে কয়েক হাজার কোটি টাকার শেয়ার বিক্রির চাপ আসবে, যা আতঙ্কজনিত কারণে ২০ হাজার কোটি টাকাও ছাড়িয়ে যেতে পারে। এর ফলে সূচকের বড় পতন ঘটবে এবং বাজারে তারল্য সংকট দেখা দেবে।

তিনি উল্লেখ করেন, বিগত কয়েক বছরে পুঁজিবাজারে নেওয়া কিছু নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। তাই বাজারের দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থে 'মিউচুয়াল ফান্ড বিধিমালা-২০২৫' এবং 'মার্জিন রুলস-২০২৫' পুনর্বিবেচনা বা বাতিল করে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সাথে আলোচনা করা জরুরি।

০ মন্তব্য


কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!