অক্সফাম ইন বাংলাদেশের সহায়তায় ব্রেকিং দ্য সাইলেন্সের আয়োজনে ও অস্ট্রেলিয়ান এইডের আর্থিক সহযোগিতায় ঢাকায় শুরু হয়েছে দুই দিনব্যাপী ন্যাশনাল কমিউনিটি বেজড অর্গানাইজেশন (সিবিও) সামিট ২০২৬। বুধবার রাজধানীর কৃষিবিদ ইনস্টিটিউটে শুরু হওয়া এ সামিটের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক বিশেষ সহকারী ড. মো. সাইমুম পারভেজ।
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় বাংলাদেশ ঋণভিত্তিক নয়, অনুদানভিত্তিক আন্তর্জাতিক জলবায়ু অর্থায়ন চায় বলে তিনি জানিয়েছেন । তিনি বলেন ‘জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য বাংলাদেশের দায় খুবই কম। অথচ যেসব দেশের কারণে বাংলাদেশ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, তাদের কাছ থেকেই ঋণ নিয়ে আবার সেই ঋণ পরিশোধ করতে হওয়া একটি ‘হাস্যকর’ বিষয়।’
উপকূলীয় অঞ্চলগুলো থেকে ১২টি কমিউনিটিভিত্তিক সংগঠন স্থাপিত স্টলে বিভিন্ন পরিবেশবান্ধব পণ্য ও উদ্যোগ প্রদর্শন করে।
ড. সাইমুম পারভেজ বলেন, ‘গ্লোবাল ইনজাস্টিসকে ক্লাইমেট জাস্টিসে পরিণত করতে হবে। এতদিন আন্তর্জাতিক পরিসরে আমরা নীরব শ্রোতার ভূমিকা পালন করেছি। এখন আমরা কথা বলা শুরু করেছি, উচ্চকণ্ঠ হচ্ছি।’
প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী আরও বলেন, সরকার বিশ্বের বিভিন্ন গ্রিন ক্লাইমেট ফান্ড থেকে অর্থায়ন আনার চেষ্টা করছে, যাতে পরিবেশ পুনরুদ্ধার (ইকোলজি রেস্টোরেশন) এবং পরিবেশ সংরক্ষণ কার্যক্রমে স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে আরও বেশি সম্পৃক্ত করা যায়। পাশাপাশি এ বছর দুই কোটি ম্যানগ্রোভ গাছ রোপণের পরিকল্পনার কথাও জানান তিনি। এসব গাছের পরিচর্যায় প্রান্তিক জনগোষ্ঠী, বিশেষ করে নারীদের সম্পৃক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হবে বলেও উল্লেখ করেন।
বিশ্বব্যাপী জলবায়ু পরিবর্তনে সত্যিকার প্রভাবের বিবেচনায় বাংলাদেশ প্রথম সারির একটি দেশ। জলবায়ু ঝুঁকি মোকাবিলায় যে পরিমাণ অর্থায়ন প্রয়োজন সেটি পায় না বাংলাদশে। যদিও কার্বন নিঃসরণে বাংলাদেশের ভূমিকা নাই বললেই চলে, তবু ক্ষতির দিক থেকে সবসময় রয়েছে সর্বোচ্চ ঝুঁকির মধ্যে। এমন প্রেক্ষাপটে অনুষ্ঠিত হচ্ছে এই সামিট।
অনুষ্ঠানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড ভালনারেবিলিটি স্টাডিজের অধ্যাপক মাহবুবা নাসরিন বলেন, জলবায়ু অভিযোজন কার্যক্রমে স্থানীয় জনগণের জ্ঞান ও অভিজ্ঞতাকে আরও গুরুত্ব দিতে হবে। প্রকল্পভিত্তিক প্রশিক্ষণের পরিবর্তে এমন জ্ঞান ছড়িয়ে দিতে হবে, যা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে বহমান থাকবে।
তিনি বলেন, দেশীয় জ্ঞান ব্যবহার করেই জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ সম্ভব। ম্যানগ্রোভ বন, প্রাকৃতিক বন কিংবা অন্যান্য প্রতিবেশব্যবস্থার জন্য একই ধরনের পরিকল্পনা কার্যকর নয়। প্রতিটি এলাকার নিজস্ব বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী সংরক্ষণ পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে এবং এ বিষয়ে তরুণদের গবেষণায় সম্পৃক্ত করতে হবে।
অক্সফাম ইন বাংলাদেশের হেড অব ক্লাইমেট জাস্টিস অ্যান্ড ন্যাচারাল রিসোর্সেস রাইটস ড. মোহাম্মদ ইমরান হাসান বলেন, বাংলাদেশের প্রকৃত উন্নয়ন গ্রামের উঠান এবং উপকূলীয় জনগোষ্ঠীর হাত ধরেই আসে। জলবায়ু অভিযোজনের ক্ষেত্রে বাংলাদেশকে বিশ্ব 'অ্যাডাপটেশন চ্যাম্পিয়ন' হিসেবে চেনে, আর এ সাফল্যের পেছনে রয়েছে স্থানীয় কমিউনিটির অবদান। সে কারণেই অক্সফাম তাদের সঙ্গে কাজ করছে।
ব্রেকিং দ্য সাইলেন্সের নির্বাহী পরিচালক রোকসানা সুলতানা বলেন, জলবায়ু সংকট দেশের নানা উন্নয়ন অর্জনকে হুমকির মুখে ফেলেছে। উপকূলীয় জনগোষ্ঠীর কাছে জলবায়ু পরিবর্তন কোনো তাত্ত্বিক বিষয় নয়; এটি তাদের প্রতিদিনের বাস্তবতা। অথচ দুর্যোগে প্রথম সাড়া দেওয়া কমিউনিটি বেজড অর্গানাইজেশন ও যুব নেতৃত্বাধীন সংগঠনগুলো এখনো আন্তর্জাতিক জলবায়ু তহবিল ও জাতীয় নীতিতে যথাযথ স্বীকৃতি পাচ্ছে না।
বন অধিদপ্তরের বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে বাস্তবায়নাধীন টেকসই বন ও জীবিকা (সুফল) প্রকল্পের পরিচালক গোবিন্দ রায় বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ারও একটি সীমা রয়েছে। তিনি কমিউনিটি সংগঠন, যুব সংগঠন এবং দেশি-বিদেশি উন্নয়ন সংস্থাগুলোর সমন্বিত উদ্যোগ জোরদারের আহ্বান জানান।
কাঠপেন্সিলের সভাপতি ফারজানা ফারুক ঝুমু জলবায়ু নীতিনির্ধারণ প্রক্রিয়ায় যুব সংগঠনগুলোর আরও কার্যকর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার আহ্বান জানান।
সামিটের প্রথম দিনের প্রতিপাদ্য ছিল ‘ক্লাইমেট লিডারশিপ, রিসার্চ অ্যান্ড পলিসি ডায়ালগ’। অনুষ্ঠানে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে অংশগ্রহণকারীরা যোগ দেন। তিনটি বিষয়ে— ফেমিনিস্ট ক্লাইমেট লিডারশিপ, ইউথ এনগেজমেন্ট অ্যান্ড দেয়ার কন্ট্রিবিউশন এবং লোকালি লেড অ্যাকশন অ্যান্ড অ্যাডাপটেশন স্ট্র্যাটেজিস—গবেষণাপত্র উপস্থাপন করা হয়।
গবেষণায় যৌথভাবে প্রথম হয়েছেন ফারহা ফাতিমা ও সানজিদ আলম সিফাত। দ্বিতীয় হয়েছেন অপূর্ব দে, আর তৃতীয় শামীমা ইয়াসমিন।
এছাড়া জলবায়ু বিষয়ে সচেতনতা তৈরি, নীতি তৈরিতে সহায়তা এবং দেশীয় ও আন্তর্জাতিক পরিসরে পরিবর্তনের বিষয়গুলো তুলে ধরতে দুদিনব্যাপী এ সামিটে থাকছে আলোকচিত্র প্রদর্শনী।
কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!