ঈদুল আজহার পর থেকে ধারাবাহিকভাবে কমছে ব্রয়লার মুরগির দাম। উৎপাদন ব্যয় বাড়লেও বাজারে কাঙ্ক্ষিত মূল্য না পাওয়ায় দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের প্রান্তিক পোল্ট্রি খামারিরা লোকসানের মুখে পড়েছেন। অনেকেই খামার ছোট করছেন, কেউ কেউ সাময়িকভাবে উৎপাদন বন্ধও রেখেছেন।
পোল্ট্রি খাত–সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, কোরবানির মাংস ঘরে মজুত থাকায় ঈদের পর মুরগির চাহিদা কমে যায়। এ বছরও একই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। তবে খাদ্য, ওষুধ ও অন্যান্য উপকরণের দাম বেশি থাকায় উৎপাদন খরচ কমাতে পারছেন না খামারিরা। ফলে কম দামে মুরগি বিক্রি করতে গিয়ে বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছেন তারা।
পঞ্চগড় সদর উপজেলার পূর্ব জালাসি এলাকার খামারি আবদুল খালেক সম্প্রতি এক হাজার ব্রয়লার মুরগি বিক্রি করে প্রায় ৭০ হাজার টাকা লোকসান গুনেছেন। তিনি বলেন, “দীর্ঘদিন ধরে খামার করছি। আগে লাভ-লোকসান মিলিয়ে চলা যেত। কিন্তু চলতি বছরের শুরু থেকে প্রায় প্রতিটি ব্যাচেই লোকসান হচ্ছে। এখন ডিলারের কাছে কয়েক লাখ টাকা দেনা হয়ে গেছে।”
একই জেলার শেখেরহাট এলাকার খামারি জুলেখা বেগম জানান, বর্তমানে উৎপাদন ব্যয় ও বাজারদরের মধ্যে বড় ধরনের ব্যবধান তৈরি হয়েছে। তিনি বলেন, “আগে মুরগির দাম কম থাকলেও খাদ্যের দামও কম ছিল। এখন খাদ্যের দাম কয়েক গুণ বেড়েছে, কিন্তু মুরগির দাম সে তুলনায় বাড়েনি। তাই আপাতত খামার বন্ধ রেখেছি।”
জগদল ঠুটাপুখরী এলাকার তরুণ উদ্যোক্তা রবিউল পারভেজ বলেন, বড় বিনিয়োগ করে খামারের পরিধি বাড়ালেও বর্তমানে লাভের পরিবর্তে লোকসানই বাড়ছে। তার ভাষ্য, “একবার ভালো দাম পাওয়া গেলে কয়েকবার খারাপ যায়। বাজারের এই অস্থিরতায় খামার পরিচালনা কঠিন হয়ে পড়েছে।”
ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার হরিহরপুর এলাকার খামারি রবিউল আউয়ালও একই ধরনের সংকটের কথা জানান। তিনি বলেন, বর্তমানে প্রতি কেজি ব্রয়লার মুরগির উৎপাদন খরচ ১৪০ থেকে ১৪৫ টাকা হলেও বাজারে বিক্রি হচ্ছে ১১০ থেকে ১২৫ টাকার মধ্যে। এতে প্রতি কেজিতে গড়ে ২০ টাকার বেশি লোকসান হচ্ছে।
পোল্ট্রি ব্যবসায়ীরা বলছেন, বাজারে মুরগির চাহিদা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। পঞ্চগড়ের পাইকারি ব্যবসায়ী আমান আলী বলেন, কোরবানির মাংসের পাশাপাশি বাজারে মাছ ও সবজির সরবরাহ বেড়ে যাওয়ায় ক্রেতারা তুলনামূলক কম মুরগি কিনছেন। ফলে পাইকারি পর্যায়েও বিক্রি কমে গেছে।
খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, মুরগির দাম কমে যাওয়ার প্রভাব পড়েছে একদিন বয়সী বাচ্চার বাজারেও। কাজী ফার্মসের মহাব্যবস্থাপক (বিপণন) সরদার সাব্বির আহমেদ বলেন, খামারিরা নতুন করে বাচ্চা তুলতে আগ্রহ হারাচ্ছেন। এতে হ্যাচারিগুলোও লোকসানের মুখে পড়েছে। তিনি মনে করেন, বাজার পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে চাহিদা বাড়বে এবং তখন বাচ্চার দামও বাড়তে পারে।
পোল্ট্রি খাতের উদ্যোক্তারা বলছেন, উৎপাদন ব্যয় নিয়ন্ত্রণে আনা এবং বাজার স্থিতিশীল রাখতে কার্যকর উদ্যোগ না নেওয়া হলে অনেক ক্ষুদ্র ও মাঝারি খামারি ব্যবসা টিকিয়ে রাখতে হিমশিম খাবেন।
আরএস-রাসেল
কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!