আচরণবিধি লঙ্ঘনে সারজিস আলমকে শোকজ সাদাকালো নির্দেশনা উপেক্ষা, রঙিন পোস্টার–ব্যানার, আগাম এমপি দাবি ও বহুরূপী রাজনীতি নিয়ে তীব্র প্রশ্ন
পঞ্চগড়-১ (পঞ্চগড় সদর, তেঁতুলিয়া ও আটোয়ারী) আসনের ১০ দলীয় জোটের প্রার্থী ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) উত্তরাঞ্চলীয় মুখ্য সমন্বয়ক সারজিস আলমের বিরুদ্ধে একাধিক গুরুতর নির্বাচনি আচরণবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগে কারণ দর্শানোর নোটিশ (শোকজ) জারি করেছে নির্বাচন কমিশন। তবে অনুসন্ধানে উঠে আসা তথ্য বলছে, আচরণবিধি ভাঙার অভিযোগের তালিকা নোটিশে উল্লেখিত সীমার চেয়েও অনেক বিস্তৃত।
শনিবার (২৪ জানুয়ারি) জেলা প্রশাসক ও পঞ্চগড়-১ আসনের রিটার্নিং কর্মকর্তা কাজী মো. সায়েমুজ্জামানের পক্ষ থেকে পাঠানো নোটিশে জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমানের ছবি ব্যবহার করে তোরণ, ব্যানার ও বিলবোর্ড স্থাপন, নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে তোরণ নির্মাণ এবং ফেসবুক আইডি দাখিল না করেই নির্বাচনী প্রচারণার অভিযোগ উল্লেখ করা হয়—যা সংসদ নির্বাচনে রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীর আচরণবিধিমালা ২০২৫-এর একাধিক ধারার সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।
এদিকে মাঠপর্যায়ে অনুসন্ধানে দেখা গেছে, যেখানে প্রায় সব প্রার্থী নির্বাচন কমিশনের নির্দেশনা অনুযায়ী সাদাকালো ছবি ব্যবহার করছেন, সেখানে সারজিস আলম প্রকাশ্যে রঙিন ছবি সংবলিত ব্যানার, ফেস্টুন ও তোরণ ব্যবহার করে চলেছেন। স্থানীয়দের অভিযোগ, নির্বাচনী প্রচারণায় তিনি কোনো নিয়ম-শৃঙ্খলাই মানছেন না—না পোস্টারের আকার, না রঙ, না স্থাপনার সীমা।
আরও গুরুতর অভিযোগ হলো, নির্বাচন এখনো অনুষ্ঠিত না হলেও বিভিন্ন সভা ও ব্যক্তিগত আলোচনায় নিজেকে ‘এমপি’ হিসেবে উপস্থাপন ও দাবি করছেন সারজিস আলম। স্থানীয়দের ভাষ্য, এ ধরনের বক্তব্য নির্বাচনী শিষ্টাচার লঙ্ঘনের পাশাপাশি প্রশাসন ও সাধারণ ভোটারদের ওপর একধরনের মানসিক চাপ তৈরি করছে।
শুধু প্রচারণা নয়, সারজিস আলমের বিরুদ্ধে দলীয় প্রভাব খাটিয়ে সরকারি অফিস ও প্রশাসন ব্যবহার করে সাধারণ মানুষকে হেয় করা, ভয়ভীতি প্রদর্শন এবং চাপ প্রয়োগের অভিযোগও উঠেছে। একাধিক সূত্র জানায়, তার পক্ষে কাজ না করলে মামলা, হয়রানি কিংবা সরকারি দপ্তরের মাধ্যমে নানাভাবে চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছে। বিশেষ করে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর প্রশাসনিক প্রভাব খাটিয়ে হয়রানি ও নির্যাতনের অভিযোগও স্থানীয়ভাবে আলোচিত।
রাজনৈতিক অঙ্গনে আরও যে বিষয়টি ঘিরে আলোচনা তুঙ্গে, তা হলো সারজিস আলমের বহুরূপী রাজনৈতিক পরিচয়। স্থানীয় রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সচেতন মহলের মতে, বিভিন্ন সময়ে ভিন্ন ভিন্ন রাজনৈতিক পরিচয়ে আত্মপ্রকাশ তার আদর্শিক অবস্থানকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে। কখনো ছাত্রলীগ সংশ্লিষ্টতা, কখনো ডিবেটার পরিচয়, কখনো ছাত্রশিবিরের সঙ্গে সম্পৃক্ততার অভিযোগ, আবার নাগরিক পার্টির নেতা হিসেবে আত্মপ্রকাশ—এমনকি নিজেকে ‘ঈমানদার ব্যক্তি’ হিসেবে উপস্থাপন—সব মিলিয়ে তাকে একজন সুযোগসন্ধানী ও অনিশ্চিত রাজনৈতিক চরিত্র হিসেবেই দেখছেন অনেকে।
বিশ্লেষকদের মতে, রাজনীতিতে মত পরিবর্তন স্বাভাবিক হলেও বারবার পরিচয় বদলানো একজন প্রার্থীর বিশ্বাসযোগ্যতা ও স্থিরতা নিয়ে বড় প্রশ্ন তোলে। স্থানীয়দের আশঙ্কা, এমন বহুরূপী ও স্বেচ্ছাচারী রাজনৈতিক চরিত্র ক্ষমতায় গেলে এই জনপদের মানুষের নিরাপত্তা ও স্বাভাবিক জীবনযাপন মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হতে পারে।
এলাকাবাসীর একাংশের ভাষ্য, সারজিস আলম যদি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন, তাহলে প্রশাসন, সংখ্যালঘু ও সাধারণ মানুষের ওপর চাপ আরও বাড়বে। তাদের ধারণা, শিক্ষাজীবন থেকে শুরু করে সরকারি ও বেসরকারি নানা সুযোগ-সুবিধার মাধ্যমে প্রভাব বিস্তার করে আসা একজন ব্যক্তির হাতে জনপ্রতিনিধিত্ব গেলে সেটি জনস্বার্থের চেয়ে ব্যক্তি ও গোষ্ঠীস্বার্থই প্রাধান্য পাবে।
এদিকে নির্বাচন কমিশনের নোটিশে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে, আগামী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে লিখিত ব্যাখ্যা দাখিল না করলে আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। সংশ্লিষ্ট মহলের মতে, এই শোকজ শুধু একটি আনুষ্ঠানিক নোটিশ নয়—বরং নির্বাচনকে ঘিরে ক্ষমতার অপব্যবহার ও স্বেচ্ছাচারিতার বিরুদ্ধে কমিশনের অবস্থান পরীক্ষারও একটি বড় মুহূর্ত।
কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!