সংগৃহীত
‘হ্যাঁ’ ভোটে সংস্কার, ‘না’ ভোটে অনিশ্চয়তার আশঙ্কা—পাল্টাপাল্টি অবস্থানে দলগুলো ঢাকা: ‘জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫’ অনুযায়ী সংবিধানের কয়েকটি মৌলিক সংশোধনী প্রস্তাবে জনগণের সম্মতি যাচাইয়ের লক্ষ্যে আসন্ন গণভোটকে কেন্দ্র করে দেশের রাজনীতিতে নতুন করে উত্তাপ সৃষ্টি হয়েছে। একদিকে অন্তর্বর্তী সরকার ও বেশিরভাগ রাজনৈতিক দল গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে, অন্যদিকে জাতীয় পার্টিসহ কয়েকটি দল এটিকে সংবিধানবিরোধী আখ্যা দিয়ে ‘না’ ভোটের আহ্বান জানিয়েছে। গণভোটে সংস্কারের পক্ষে ভোট পড়লে ব্যালটে ‘হ্যাঁ’ এবং বিপক্ষে হলে ‘না’ ভোট দিতে হবে। প্রস্তাবিত সংস্কারের মধ্যে রয়েছে—প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতায় ভারসাম্য আনা, নির্বাচন কমিশনের সাংবিধানিক স্বাধীনতা জোরদার, বিচার বিভাগের স্বায়ত্তশাসন নিশ্চিত, প্রশাসনে দলীয়করণ হ্রাস এবং মৌলিক অধিকার ও ভোটাধিকার সুরক্ষা। সরকারের অবস্থান ও প্রচারণা অন্তর্বর্তী সরকারের মতে, এসব সংস্কার বাস্তবায়িত হলে ভবিষ্যতে কর্তৃত্ববাদী শাসনব্যবস্থা বা একক ক্ষমতাকেন্দ্রিক রাজনীতির ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমবে। এ লক্ষ্য সামনে রেখে সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসসহ একাধিক উপদেষ্টা প্রকাশ্যে গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোটের আহ্বান জানাচ্ছেন। জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সদস্যরাও বিভিন্ন সভা, কর্মশালা ও সমাবেশে সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরছেন। বিভাগীয় পর্যায়ে জনসভা আয়োজন, ব্যানার-পোস্টার টানানো এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও প্রচারমাধ্যমে বিজ্ঞাপন দেওয়া হচ্ছে। গতকাল খুলনায় ইমাম সম্মেলনে প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী অধ্যাপক ড. আলী রীয়াজ বলেন, ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান জাতির ইতিহাসে এক অসাধারণ অর্জন। এই অর্জন আমাদের সামনে গণতন্ত্র, ন্যায়বিচার ও মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার ঐতিহাসিক সুযোগ এনে দিয়েছে। দেশের সব রাজনৈতিক দলের ঐকমত্যের ভিত্তিতে জুলাই সনদ প্রণয়ন করা হয়েছে। এই সনদ বাস্তবায়নের জন্য জনগণের সরাসরি সম্মতি প্রয়োজন, আর সেই উদ্দেশ্যেই গণভোটের আয়োজন। গণভোটে হ্যাঁ ভোট দিলে বৈষম্য, শোষণ ও নিপীড়ন থেকে মুক্ত হবে বাংলাদেশ।’ পক্ষে–বিপক্ষে রাজনৈতিক অবস্থান গণভোটের পক্ষে থাকা দল ও সমর্থকদের মতে, জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে জনগণের সরাসরি অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে গণভোট সবচেয়ে কার্যকর মাধ্যম। সংসদের বাইরেও জনগণের মতামত নেওয়া হলে সিদ্ধান্তের গ্রহণযোগ্যতা ও বৈধতা বাড়ে। বিশেষ করে সংবিধান সংশোধন বা রাষ্ট্রীয় কাঠামোগত বড় পরিবর্তনের ক্ষেত্রে গণভোট গণতন্ত্রকে আরও শক্তিশালী করে। একটি রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতা বলেন, ‘জনগণই রাষ্ট্রের মালিক। তাই জনগণের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে জনগণের মতামতই হওয়া উচিত চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের ভিত্তি।’ অন্যদিকে, গণভোটের বিরোধীদের আশঙ্কা—বর্তমান সামাজিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতায় গণভোট বিভাজন সৃষ্টি করতে পারে। আবেগ, অপতথ্য এবং প্রভাবশালী গোষ্ঠীর প্রচারণার কারণে প্রকৃত জনমত প্রতিফলিত না হওয়ার ঝুঁকিও রয়েছে বলে তারা মনে করছেন। জাতীয় পার্টির আপত্তি জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান জি এম কাদের গণভোটকে ‘সংবিধানবিরোধী ও অবাস্তব’ আখ্যা দিয়ে দেশবাসীকে এতে ‘না’ ভোট দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। রাজধানীতে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, ‘সংবিধান সংশোধনের মতো জটিল বিষয় গণভোটের মাধ্যমে করার কোনো বিধান সংবিধানে নেই। এটি কেবল নির্বাচিত সংসদই নির্ধারিত প্রক্রিয়ায় করতে পারে। এই প্রক্রিয়া বাস্তবায়িত হলে দেশ চরম অনিশ্চয়তার দিকে এগিয়ে যাবে।’ এ ছাড়া আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরাও বিভিন্ন মাধ্যমে প্রকাশ্যে ও গোপনে গণভোটে ‘না’ ভোটের পক্ষে প্রচারণা চালাচ্ছেন বলে জানা গেছে। ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে জোট ও দলগুলো জামায়াতসহ আন্দোলনরত সমমনা ও ইসলামী দলগুলোর লিয়াজোঁ কমিটির বৈঠকে গণভোটে ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে দেশব্যাপী প্রচার চালানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। পরে এনসিপি, এলডিপি ও এবি পার্টি যুক্ত হলে জোটে দল সংখ্যা দাঁড়ায় ১০টিতে। জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, ‘এই সংস্কার মানে দুর্নীতি, ফ্যাসিজম ও দলীয়করণকে না বলা। এটি ন্যায়বিচার, ভোটাধিকার ও আইনের শাসনের পক্ষে জাতির ঐক্যবদ্ধ সিদ্ধান্ত।’ বিএনপির অবস্থান শুরু থেকেই জাতীয় ঐকমত্য কমিশনে একমত হওয়া বিষয়গুলো বাস্তবায়নের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে বিএনপি। দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, ‘সংসদে যে বিষয়গুলো নিয়ে গণভোট হচ্ছে, সেগুলো আমরা বহু আগে ৩১ দফার মাধ্যমে জাতির সামনে উপস্থাপন করেছি। সংস্কার আমাদের রাজনৈতিক দর্শনের অংশ। এখানে না বলার কোনো কারণ নেই।’ বিএনপির নির্বাচনী মুখপাত্র ড. মাহাদী আমীন জানান, গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে দলীয় অবস্থান সবাইকে জানানো হয়েছে। নোট অব ডিসেন্ট নিয়ে ভবিষ্যতে সংসদে আলোচনা হবে বলেও তিনি উল্লেখ করেন। বিশ্লেষকদের মত গণভোট নিয়ে রাজনৈতিক বিভাজন প্রসঙ্গে রাজনৈতিক বিশ্লেষক অধ্যাপক ড. মো. সাহাবুল হক বলেন, ‘সরকার ও বেশিরভাগ রাজনৈতিক দলের সমর্থন গণভোটের পক্ষে ইতিবাচক। তবে অপপ্রচার ও তথ্য ঘাটতির কারণে সাধারণ মানুষের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি হতে পারে।’ তিনি আরও বলেন, সরকারকে সচেতনতামূলক প্রচারণা জোরদার, সমমনা রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে যৌথ প্রচারণা কৌশল গ্রহণ এবং ভিত্তিহীন প্রচারণার বিরুদ্ধে প্রমাণভিত্তিক বার্তা প্রচার করতে হবে। সামনে কী সংসদ নির্বাচনের ডামাডোলের মধ্যেই গণভোট ইস্যুতে রাজনৈতিক উত্তেজনা বাড়ছে। পর্যাপ্ত জনসচেতনতা ও স্বচ্ছ প্রক্রিয়া নিশ্চিত করা না গেলে ভোটারদের অংশগ্রহণ ও গ্রহণযোগ্যতা প্রশ্নের মুখে পড়তে পারে—এমন আশঙ্কাও করছেন বিশ্লেষকরা। সবকিছু মিলিয়ে আসন্ন গণভোট শুধু একটি সাংবিধানিক সিদ্ধান্ত নয়, বরং ভবিষ্যৎ রাষ্ট্র কাঠামো ও রাজনৈতিক সংস্কৃতির দিকনির্দেশনা নির্ধারণের গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত হিসেবে দেখা হচ্ছে।
কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!